কামতেশ্বরের গড়ে সৌন্দর্যায়ন ও রাস্তা সম্প্রসারণ: সমালোচনা বিদ্ধজনেদের

131

শীতলখুচি, ৬ আগস্টঃ গোসনিমারি রাজপাট ও কাম্তেশ্বরী দেবীর মন্দির  কোচবিহার তথা উত্তবঙ্গের ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। উক্ত দুই স্থানের সাথে কোচবিহারের মানুষ জনদের প্রানের সম্পর্ক।

জানা গেছে, ঐতিহ্যের সুমহান সাক্ষী এই দুই স্থানের প্রথমটির প্রাচীনত্ব পাল যুগের সমসাময়িক ১৯৯৮-২০০০ সালে ভারতীয় প্রত্নতাত্মিক সর্বেক্ষণ দ্বারা উত্তরবঙ্গের ইতিহাসের এই দিকটি উন্মোচিত হয়েছে। তুলনায় কাম্তেশ্বরী দেবীর মন্দির সংলগ্ন স্থান পাল যুগের না হলেও খেন শাসন কালের (একাদশ-চতুর্দশ শতাব্দী)। ওই সময়ের স্থায়ী বা অস্থায়ী মন্দিরের কাঠামো বহুবার বিদেশী আক্রমনের দ্বারা ধ্বংস সাধিত হওয়ার পরে কোচবিহারের মহারাজা প্রান নারায়ন ১৫৮৭ সালে কাম্তেশ্বরী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন বর্তমান মন্দিরটি।

কিন্তু উক্ত দুই স্থানই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে যেটি ছাড়া, সেটি হল খেন আমলে নির্মিত কাম্তেশ্বরের গড়। গোসানিমারি রাজপাটের উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশ ঘিরে প্রায় ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ ঘোড়ার খুড়ের মত আকৃতি যুক্ত,উচু মাটির প্রাচীরটি গোসানিমারি মাসানপাট মন্দির থেকে শুরুকরে শিল্দুয়ার হয়ে বড়গদাই খোড়ায় এসে শেষ হয়েছে।

প্রত্নতত্ত্ববিদ সুধীর রঞ্জন দাসের মতে, নির্মাণকালে এই পরিখাটি ৪০ ফুটের বেশী উচু ছিল। বর্তমানে এর গড়ে উচ্চতা ৩৫ ফুটের মত আছে। কিছু কিছু স্থানে আবার এর উচ্চতা অস্বাভাবিক ভাবে হ্রাস পেয়েছে। যেমন জিগাবাড়ির কাছে এর উচ্চতা আছে মাত্র ১০ ফুট। সুউচ্চ এই প্রাচীরে প্রবেশের জন্য সাতটি প্রবেশদ্বার ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল শিল্দুয়ার। পাথর নির্মিত এই প্রবেশ পথটির নিদর্শন ১৯৫০এর দশকেও বিদ্যমান থাকলেও সংরক্ষণের অভাবে বর্তমানে এটি আর চোখে পরে না। স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই মূল্যবান নিদর্শন বহুদিন ধরেই স্থানীয় দুষ্কৃতীদের দ্বারা ধ্বংস হয়েছে ফলে লোপ পেয়েছে তার প্রকৃত আকার বিভিন্ন স্থানে।

সম্প্রতি এই ধ্বংস সাধনের কাজে হাত দিয়েছে ছোট শালবাড়ি এলাকার স্থানীয় প্রশাসন। গত কয়েকদিন আগে গড় কামতেশ্বর এর সৌন্দর্যায়ন ও রাস্তা সম্প্রসারণ এর কাজে হাত দিয়ে স্থানীয় প্রশাসন গড় কামতেশ্বরের প্রকৃত কাঠামোটি খনন শুরু করে। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কৃষ্টি ধ্বংসের এই কর্মকান্ডের সমালোচনা করেন বহু স্থানীয় মানুষ। তাদের মতে রাস্তা গড় কামতেশ্বরের মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে তার পাশ দিয়েও করা যেতে পারে। স্থানীয় ছাত্র-ছাত্রীরাও বিষয়টির বিরোধিতা করে মাথাভাঙ্গা মহকুমা শাসকের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেছে।

ইতিহাসবিদ ও অধ্যাপক চঞ্চল অধিকারী বলেছেন, খেন রাজাদের দ্বারা নির্মিত এই সীমানা প্রাচীর শুধুমাত্র কোচবিহার নয় সমগ্র উত্তর পূর্ব ভারতের ইতিহাস নির্মানে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে। এইভাবে ঐতিহ্যের ধ্বংস পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশনের ২০০১ সালের আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই কাজকর্ম চলতেই থাকলে তা সমাজের প্রচুর ক্ষতিসাধন করবে-আমরা আমাদের উত্তরসূরীর জন্য ইতিহাসের কোনো প্রামান্য রেখে যেতে পারব না,যা সত্যিই উদ্বেগের। স্থানীয় প্রশাসনের স্থানীয় ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক ধারনা রেখে সেগুলির সংরক্ষন করতে হবে ধ্বংস নয়।

এবিষয়ে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হরিমাধব রায় বলেছেন, সত্য ইতিহাস উদঘাটনের জন্য আর্কেওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া বা ওই জাতীয় কোন সংস্থা যদি খননকার্য চালাত, তাহলে তা অবশ্যই গ্রহনযোগ্য ছিল কিন্তু নিছক সৌন্দর্য বৃদ্ধি বা শ্রমিককে কাজ দেওয়ার জন্য অতীত ইতিহাসের এই সম্পদ নষ্ট করার কোনো যৌক্তিকতা নেই, শ্রমিককে কাজ অন্যত্রেও দেওয়া যেতে পারে।