শৌভিক রায়

প্রতি বছর পুজো এলে

দেখতে দেখতে দশমীও চলে আসে।

দীর্ঘদিনের অপেক্ষা মহালয়া স্পর্শ করলেই যে উত্তেজনা তা স্তিমিত হতে চলছে আর খানিক বাদেই। প্রথমা, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া করে খুব দ্রুত যেন এই এসে পড়াটা!

মাঝের ক’দিন মায়ের চিন্ময়ী রূপে বিভোর হয়ে পাড়ায় পাড়ায় প্রতিমা দর্শন আর বাড়িতে সবার সঙ্গে হৈ চৈ। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের এই অনুভূতি পাল্টাবে না কোনদিনই।

তবে অতীতের সঙ্গে তুলনায় এখন কিন্তু চিত্রপটটি আলাদা। সে আমলে এত পুজোই বা ছিল কোথায়!  থিম পুজো, স্পনসরার, শারদ সম্মান  ইত্যাদি শব্দেরা ভবিষ্যতের আলমারিতে তালাবন্ধ। বাইরে খাওয়ার চল ছিল না আদৌ। পুজোর সময় বাড়িতে আসা পিসী, জেঠা, কাকা আর পিসতুতো খুড়তুতো ভাইবোনেদের সঙ্গে দিনভর গল্প খুনসুটি সেরে একদিন সকালে দেখতাম দশমী হাজির।

বাবার নির্দেশে দশমীতে বইয়ের পাতা ওল্টাতে হ’ত সকালে খানিকক্ষণ। বেলা বাড়লে মা-কাকীমাদের সিঁদুরদানের ফাঁকে বই ছুঁইয়ে আনতাম মায়ের পায়ে। অবধারিতভাবে সেদিন সারা বাড়িতে মাংস রান্নার গন্ধ মো মো করত। খিদেও বোধহয় তুলনায় তাড়াতাড়ি পেত!

দুপুর ঢললেই অপেক্ষায় থাকতাম ভাসানের। বাড়ির সামনে চেয়ার পেতে বসা হ’ত। একে একে সব পাড়ার ঠাকুর চলে গেলে শুরু হ’ত বিজয়া।

প্রথমেই ঠাকুরদা-ঠাকুমা সহ বড়দের প্রণাম ছিল অবধারিত। কাকু বা জেঠু কেউ একজন জিলিপি বা রসগোল্লা নিয়ে আসতেন। প্রীতি ও শুভেচ্ছার বিজয়ার হাতেখড়ি সেভাবেই হয়েছিল।

সে রাতে, সম্ভব হলে, পাড়া প্রতিবেশীদের বাড়িতে যাওয়া হত। না হলে পরদিন। কোনো আমন্ত্রণের ব্যাপার ছিল না। বিজয়া করতে যেতে হবে এটাই নিয়ম। দেখা হত না আর অন্য কোনও কিছু। পরিচিত, স্বল্প পরিচিত সবাইকেই আমাদের ছোটদের চলত প্রণাম। বড়রা কোলাকুলি করতেন। মায়েদের দেখতাম হাত ধরে পাড়ার অন্য মহিলাদের সম্ভাষণ করতে। প্রণামের পর প্রায় প্রতি বাড়িতে জুটত মুড়কি, চিড়ে বা মুড়ির মোওয়া, নারকেলের নাড়ু, তিলের তক্তি। কেউ কেউ ঘুঘনি করতেন। আর এই বাড়িগুলি ছিল আমাদের বিশেষ টার্গেট। কেননা মিষ্টি খেয়ে খেয়ে মুখের বাজে অবস্থায় ঘুঘনি ছিল অমৃত।

শুভেচ্ছা বিনিময় ও সাদর সম্ভাষণের ফাঁকে আর একটা কাজ করতে হত। পোস্ট অফিস থেকে কিনে আনা পোস্টকার্ডে মামাবাড়ি থেকে শুরু করে পুজোতে দেখা না হওয়া দূরে থাকা  আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের চিঠি লেখা হত। গোছা গোছা সেই চিঠির গোছা গোছা উত্তর আসতে শুরু করত দিন সাতেক পর থেকে। সেই চিঠিগুলিতে লেগে থাকত প্রিয়জনেদের স্নেহস্পর্শ, ভালবাসা। কোনো বিশেষ চিঠি সবার সামনে খুলতে না পেরে বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে কাঁদতেও দেখেছি কতজনকে! তখন বুঝতাম না অশ্রুও কত মধুর হতে পারে।

সময় পাল্টেছে। পিৎজা-বার্গার-পাবজির যুগে নারকেলের নাড়ু এক আজব বস্তু। ফ্ল্যাট কালচারের এই সময় পাড়া আর কোথায়? ওপরের ফ্ল্যাটের টেকো ভুঁড়িওয়ালা লোকটার পরিবারের সবারই মুখ চিনি কিন্তু কথা নেই কারো সঙ্গে। প্রণাম? নিজের বাবা মা’কেও আজকাল ঠিকমতো প্রণাম করি না। বাকি গুরুজনেরা কবেই বিদায় নিয়েছেন! ডেলিভারি বয় এখন পোস্টম্যানের জায়গা নিয়েছে। চিঠি-ফিঠি অতীতে ছিল। আঙুলের এক টাচে যেভাবে এই লেখা পৌঁছে যাচ্ছে এফ এম রেডিওর দপ্তরে, ঠিক সেভাবেই মেসেজে বা ভিডিও কলে সেরে নিচ্ছি প্রথাগুলি। চিঠির অপেক্ষা নেই আর। চলতি যুগের হাওয়ায় সব কিছু বড্ড তাড়াতাড়ি।

এভাবেই সময় বদলে যায়। পালটে যায় যুগ। কোনোটাই খারাপ নয়। সময়ের সাপেক্ষে বদলানোটাই দস্তুর। তাই মন্দ লাগে না ক্যালিফোর্ণিয়া থেকে ভিডিও কলে বন্ধুর ছেলের ভাঙাভাঙা বাংলার বিজয়ার প্রণাম। আবার কাঁপা গলায় বড়কাকুর আশীর্বাদ দেওয়াও রোমাঞ্চ জাগায়। প্রতিটি যুগ নিজের মতো করে পালন করে সব। করতে হয়। এটাই যে যুগধর্ম।

 তাই সেকালের হয়েও একালের বিজয়া আমার কাছে এক রয়ে গেছে। বিজয়া মানেই এক মহামিলন। মরচে ধরা সম্পর্কগুলিকে একটু নাড়াচাড়া করা।

এভাবেই চলবে বিজয়া সব বছরে। শুধু একটা বছর আসবে যেদিন নিজে থাকবো না সেদিনের বিজয়া দেখতে, কিন্তু বিজয়া থাকবে আজকের মতোই….