রামেশ্বরপুরের ঐতিহাসিক ঘোষ বাড়ির দুর্গা পূজা শুরু হল ঘট পুজোর মধ্য দিয়ে

88

শ‍্যাম বিশ্বাস, উওর ২৪ পরগনা: উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় প্রাচীন কাল থেকে হয়ে আসা দুর্গাপূজা গুলির মধ্যে অন্যতম একটি পূজা হলো হাসনাবাদ সংলগ্ন রামেশ্বরপুরের ঐতিহাসিক ঘোষ বাড়ির দুর্গা পূজা। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ইছামতি নদীর ধার ঘেঁষা রামেশ্বরপুরের এই দুর্গাপূজা হয়ে আসছে কয়েক শতাব্দী ধরে। আনুমানিক ৫৭৭ বছরের বেশি পুরানো এই দুর্গাপূজা ধারাবাহিকভাবে হয়ে আসছে পৌরাণিক রীতিনীতি মেনেই।

ঘোষ বাড়ির সদস্যদের কাছ থেকে জানা যায়, রথের দিনে কাঠামো কেটে প্রতিমা তৈরীর কাজ শুরু হয়ে যায়। মৃৎশিল্পীরা ঠাকুরদালানে এসেই প্রতিমা তৈরি করে যান প্রতিবছর। তারা আরো বলেন যে, আমরা বংশপরম্পরায় জানতে পারি যে, এই ঠাকুরদালানটি প্রথমদিকে গোলপাতা ও বাঁশের থাকলেও পরবর্তীকালে মাটির নির্মাণ করা হয় এবং তার ও পরে জমিদার আমলে তা কংক্রিটের তৈরি করা হয়। তারা এও দাবি করেন, জেলার অন্যান্য পূজা থেকে এই পূজার আনন্দ একটু স্বতন্ত্র ধরনের। কারণ এখানে দশ দিন যাবৎ এই দুর্গাপূজার আনন্দ উপভোগ করা হয়।

 পরিবারের সদস্যরা বলেন, সারাবছর কর্মসূত্রে পরিবারের সদস্যরা দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও এই সময়টাতে আমরা সকলেই একত্রিত হই এবং আনন্দ উপভোগ করি। এই ঘোষ বাড়ির কালী পূজাতেই বাংলা সিনেমা ‘নিমন্ত্রণ’ এর শুটিং হয়েছিলো অনুপ কুমার ও সন্ধ্যা রায় সহ ছবির অন্যান্য কলাকুশলীদের উপস্থিতিতে এবং এই বিষয়টি তারা আজ ও স্মৃতিতে ধারণ করে বিশেষ আনন্দ উপভোগ করেন।

ঘোষ বাড়ির সব থেকে বয়স্ক ব্যক্তি নির্মল ঘোষ বলেন, আমাদের এই ঘোষ বাড়ির পূজা বহু প্রাচীনকাল থেকে হয়ে আসছে। সেসময় এখানে আশপাশে কোথাও দুর্গাপূজা হতো না। তাই এই পূজায় আশপাশ থেকে প্রচুর মানুষ জন এখানে আসতো পূজা দেখতে। এখানে পুরনো রীতি মেনেই দুর্গা দালানে একচালার ঠাকুর তৈরি হয়। ঘোষ বাড়ির প্রাচীন এই দুর্গাপূজার বর্ণনা দিতে গিয়ে নির্মল বাবু বলেন, শ্রাবণ এবং ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষে বৃষ্টির জল পিতলের গামলায় ধরে রেখে পূজার কাজ চালানো হয়। মূলত দেবীকে স্নান করানো হয় এই জলে।

প্রতিপদে এখানে ব্রাহ্মণ প্রথমে ঠাকুরদালানে লক্ষ্মীর আড়ি পাতেন এবং তারপর ঘট বসান। ষষ্ঠীতে দেবীমুর্তির সাজানো হয় শাড়ি, সোনার হার, দুল টিপ প্রভৃতি দিয়ে। প্রতিদিন স্নান করানো হলেও শাড়ি বদলানো হয় না দেবীর। মন্ত্রপাঠ সকলের কানে পৌঁছে দিতে মাইক্রোফোনের ব্যবহার ও নেই এই পূজায়। এক্ষেত্রে পুরোহিতের কণ্ঠস্বর যতদূর পৌঁছায় ততদূর পর্যন্ত মানুষ শুনতে পাবেন এই পূজার মন্ত্র উচ্চারণ। আর সন্ধ্যাবেলায় সন্ধ্যা আরতি হয় পূজার দিনগুলোতে। ঘোষ বাড়ির দেবীপ্রতিমা কে ঘিরে অনেক রকম প্রচলিত ধারণা আছে।

ঘোষ বাড়ির দাবি,উমা বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার সময় নেয়ে খেয়ে যাবেন না ।হয় স্নান করে যাবেন, নয়তো খেয়ে যাবেন। তাই  তাই দশমীতে দেবী আর স্নান করেন না ।পরিবারের সদস্যরা কাঁধে চড়িয়ে ইছামতি নদীতে নিয়ে গিয়ে তাকে বিসর্জন দেন। আর এই নিয়মে বাড়ির মেয়েরাও শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার সময় স্নান করেন না। আজও সেই নিয়মের কোন ব্যতিক্রম হয়নি এই ঘোষ বাড়িতে।

 স্থানীয় মানুষজন দাবি করেন যে, ঘোষ বাড়ির দেবী দুর্গা মা জাগ্রত। তাই এখানে প্রচুর মানুষ মানত করে থাকেন।তাদের সেই মনস্কামনা পূরণ হলে দণ্ডী কেটে বা সাধ্যমত গয়না  দেন দেবীকে। তারা বলেন, পূর্বে এখানে বন্দুকের গুলির আওয়াজ করে এই জমিদার বাড়ি পূজার উদ্বোধন হত;যদিও এখন আর তা নেই। বিজয়া দশমীতে ঘোষ বাড়ির মেয়ে বৌউরা মেতে ওঠেন সিঁদুর খেলায়। তারপর  বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবর্তী ইচ্ছামতী নদী বক্ষে নৌকাযোগে প্রতিমা ঘুরিয়ে সূর্যাস্তের পর বিসর্জন দেওয়া হয় নদীবক্ষে। এই ঘোষ বাড়ির দুর্গাপূজা তাই জেলার আজও ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা গুলির মধ্যে অন্যতম।