বসন্তের ছোঁয়ায় ব্যর্থ প্রেম

663

এই অস্থির, অসংলগ্ন, অসময়েও বঙ্গ প্রকৃতিতে এক নতুন সাজ। ফাগুনের এই সময়ে রঙে, রূপে, রসে, বর্ণে যেন এক অন্য ছটা। শুধু হতাশায় ডুব মেরে থাকায় নয়, অন্ধকারের বৃন্ত থেকে খসাতে হবে বিকৃতের বিষফল। কারণ এই বসন্তেই গাঁথা হয় জয়ের মালা। ‘বসন্ত এসে গেছে’। শুরু হল এনিয়ে আমাদের ধারাবাহিক প্রতিবেদন। এই পর্বের ষষ্ঠ দিনে কলম ধরেছেন সাংবাদিক মনিরুল হক

মনিরুল হক

বসন্তের আগমনের সাথে সাথে প্রকৃতি তার প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয় এমন এক মোহময় সুবাস, যার আবেশে প্রতিটি মানুষের মনে বেজে ওঠে ভালোবাসার বার্তা। এই বসন্ত এমনই এক ঋতু, যার ছায়ায় ছায়ায় মিশে থাকে রঙ। যার বেদনার প্রকাশ হয় সুরে সুরে। যার দিন রাতের দোলায় মিশে থাকে অসংখ্য ভালোবাসার কাহিনী। আর এমনই বসন্তে মানব-মানবীর মনের গভীরে ঘুমিয়ে থাকা হাজার বছরের কাব্যের ব্যঞ্জনা প্রতিধ্বনিত হয়ে কড়া নেড়ে যায় মনের মানুষের হৃদয়ের গোপন কুঠরিতে।

আকাশের সবগুলো রঙ একসাথে হয়ে নেমে আসে ধরণীর বুকে। দখিনা বাতাসের তানে পাতার বাঁশির সুরের মূর্ছনায় দুলে উঠে প্রতিটি প্রেমিকের মন। আনমনে তাই তারা গেয়ে ওঠে- “ভালোবাসি ভালোবাসি, এই সুরে কাছে দূরে জলে স্থলে বাজায় বাঁশি।” আর ভালোবেসে জলে কিংবা স্থলে বাজানো এই বাঁশির সুরে পাগল হয়ে যাওয়া প্রেমিক প্রেমিকাকে তাই পাড়ি দিতে হয় দুর্গম পথ। দুর্গম এই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে তারা স্বীকার হয় নানা বাধা বিপত্তির। সেই বাধা পার হতে গিয়ে কেউ হয় সফল আবার কেউবা বিফল। কারও ভালোবাসার সুবাস ছড়িয়ে যায় বসন্তের ফুলে ফুলে। আবার কারো ভালোবাসা ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে কখনও ত্যাগ করতে হয় সমাজ সংসার আবার কখনও বা পৃথিবী। কিন্তু যে পৃথিবী সৃষ্টির মূলে রয়েছে ভালোবাসা, সেই ভালোবাসারই জন্য পৃথিবী ত্যাগ করতে হবে কেন?

যে ভালোবাসার আবেশে তরুণ-তরুণী গড়ে তোলে এক স্বপ্নের পৃথিবী, সেই ভালোবাসার পরিহাসে স্বপ্নের পৃথিবীকে আবার অকালে বিদায় জানায় তারাই। যে ভালোবাসা পৃথিবীকে পরিণত করে স্বর্গে, আবার সেই ভালোবাসাই পৃথিবীকে করে তোলে নরকের চেয়েও জঘন্য। তাই তো কবির মনে প্রশ্ন জাগে, “সখী ভালোবাসা কারে কয়, সে কী কেবলই যাতনাময়? সে কী কেবলই চোখের জল, সে কী কেবলই দুখের শ্বাস?” যদি তাই-ই হতো, তবে কী কোন প্রেমিক তার প্রেমিকার জন্য সমস্ত পৃথিবী তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনবে একশ’ আটটি নীল পদ্ম? হাজার বছর ধরে পথে পথে হেঁটে যেতো কোন প্রেমিক বনলতা সেনের ভালোবাসায়? কিন্তু প্রশ্ন জাগে, ভালোবাসার মূল্য দিতে পৃথিবীর সমস্ত কিছু উজাড় করে দিয়ে কী সুখ পায় তারা? না কী এই যাতনার মাঝেই লুকিয়ে আছে সমস্ত সুখের? আর তাই কি নির্ঘুম রাতে চোখের জলকেই ভালোবেসে কেউ কেউ সুখ পায়? আর কেউ হয়তো ধরেই নেয়, ভালোবাসার অর্থ হলো দুঃখ পাওয়া বা হঠাৎ করে খুব সহজে বদলে যাওয়া।

এমনি এক ঘটনা ঘটে গেছে আমার জীবনের মধ্য দিয়ে । সময়টা ছিল ২০১১ সাল। আমার প্রথম ভালোবাসার মানুষটি ছেড়ে চলে গেলো তখন মনের দুঃখে দিশাহারা জীবন। কিন্তু পারিবারিক পরামর্শে পেয়ে গেলাম চলার মসৃণ পথ। এবার শিক্ষায় দীক্ষায় আরও উন্নত করতে হবে নিজেকে। এরপরই ২০১২ সালে বাংলা নিয়ে কল্যানী বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পড়তে গেলাম। ৮ মাস কেটে যাওয়ার পর হঠাৎ আমার একজন খুব প্রিয় মানুষের কথা মনে পড়ছিল। সে হলো সোনালী পারভীন(পরিবর্তিত নাম)।

পড়াশোনা চলাকালীন দোল খেলতাম আমরা প্রতিবছর একসাথে। হয়তো ও আমার বাড়িতে আসত না হয় আমি ওর বাড়িতে যেতাম। অনেকের চোখ ফাঁকি দিয়ে আমরা দোলএর দিন নিজেদের রাঙিয়ে নিতাম। রঙ খেলতাম চুটিয়ে। আমাদের রঙ খেলার ক্ষেত্রে কিছু বিধি নিষেধ ছিল বটে, তবে তাকে উপক্ষা করেই সামিল হতাম দোলের উৎসবে। কিন্তু আমি তখন কল্যানী বিডিও অফিস সংলগ্ন একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। সামনের দোল উৎসব তাই আমি বাড়ি এসেছি। চারিদিকে বসন্তের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। আমার মনে সোনালীর জন্য প্রেমটাও অনেক আগে থেকেই জমা হয়ে আছে। সোনালী ও আমি একই সাথে দিনহাটা কলেজে পড়াশোনা করতাম। আমার কলেজ পড়া শেষে হলে আমি চলে যাই কল্যাণীতে পড়তে। আর সোনালী দিনহাটা কলেজে বাংলা অনার্স নিয়ে পড়তে থাকে। ওই সময় সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে সোনালীর ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারে নি। তার একটি বছর নষ্ট হয়ে যায়।

একটা সময় দুজন দুজনকে ছাড়া চলতো না, স্কুলে একসাথে বসে গল্প, নিজেদের টিফিন কাড়াকাড়ি করে খাওয়া, দুজনের মধ্যে একজন স্কুলে না এলেই মন খারাপের পালা। আমাদের বন্ধুত্ব ছিল সীমাহীন এবং গভীর। কিন্তু এই বন্ধুত্বের মধ্যে কখন যে সোনালী আমাকে ভালবেসে ফেলেছে তা বুঝতে পারিনি। আমি কোনদিন বোঝার চেষ্টা করি নি।

স্কুল শেষ করে কলেজ যাওয়ার পর থেকেই আমি একটু একটু করে সোনালীর ভালোবাসার অনুভব করতে থাকি। কারণ সেই সময় আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি। তাই ধীরে ধীরে আমদের যোগাযোগও একটু করে কমতে শুরু করল। কিন্তু তার সাথে দেখা ও কথা হয় অল্প সল্প, কোন মেসেজ বা ফোনের মাধ্যমে। তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষার আগে সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। পরে সোনালী ১৫দিন হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরে আসে সুস্থ হয়ে।সে বার আর পরীক্ষা দিতে পারে না। পরে পরীক্ষা শেষে তার বাড়িতে গিয়ে দেখে এসেছিলাম। তারপর আমার কলেজ শেষ। আমি পড়তে গেলাম কল্যাণীতে। কয়েকমাস পরে দোলের ছুটিতে বাড়িতে ফিরে আসবো আমি। তখন থেকে সোনালীর কথা খুব মনে পড়ছে। আমি মনে মনে ঠিক করলাম।

এবার বাড়ি এসে সোনালীকে আমার মনের কথা বলব। তাই বাড়ি এসেই সোনালীকে ফোন করলাম…… হ্যালো সোনালী আমি মনিরুল (সাগর) বলছি, কেমন আছিস তুই ?? ওপার থেকে সোনালী উত্তর দিল। ভালো আছি,তুই তো আমাকে ভুলে গেলি রে। যাদের আমি সব সময় কাছের ভাবি সে আমাকে পর করে দেয় রে। আমি ওকে বললাম না রে ভালোবাসার মানুষ কে কি ভোলা যায়। তোর কথা খুব মনে পড়ছে রে। তাই তোকে ফোন করলাম। চাচা ও চাচি কেমন আছে রে। সোনালী বললো ভালো। কবে বাড়ি আসবি তুই? আজ রাতে নামবো। কাল সকালে বাড়িতে ফিরবো। “কাল (৭ মার্চ, ২৩ ফাগুন বুধবার) তুই আমার সাথে একবার দেখা করতে পারবি ? সোনালী বললো তুই চাইলে রাতেই গিয়ে তোর বাড়িতে বসে থাকবো। ছাড় ইয়ার্কি মারিস না পারবি কি না বল।”কেন বলতো ?? “দরকার আছে প্লিজ একবার দেখা কর, কিছু কথা আছে” বেশ বল কোথায় দেখা করতে হবে, কখন ? ” কলেজ যাওয়ার পথে যেখানে থাকিস সেখানে বিকেল বেলায়। আমি আর কিছু বললাম না, সোনালী ও আর কিছু বলল না। শুধু ঠিক আছে বলে ফোনটা রেখে দিলাম।

আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম সোনালী হয় তো সব বুঝে গেছে। তারপর সাইকেলটা নিয়ে আমি হাসপাতাল মোড়ে সিপিআইএম পার্টি অফিসের পাশে শিশু উদ্যানের সামনে পৌরসভা যাওয়ার রাস্তায় দাড়িয়ে সোনালীর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর সোনালী এসে আমার পিছনে সাইকেলের বেল দিতে লাগলো। আমি পিছন ফিরে দেখেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো সোনালীর দিকে তাকিয়ে রইলাম। সোনালী বললো কিরে কিছু বল। কেমন আছিস ? সোনালী মিষ্টি হাসি মুখের কথা গুলো যেন আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেল । আচ্ছা তুই এত রোগা হয়ে গেলি কি করে,খাস নাকি ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে শুধু মেয়েদের পিছনে ঘুরেছিস। আমি যদি সেখানে থাকতাম তাহলে তোকে জোর করে খাওয়াতাম। আর কোনো মেয়ের পিছনে ঘুরতে দিতাম না। এতক্ষণ আমি কিছু বলেনি, শুধু সোনালী বলে যাচ্ছে।

একটু হেসে আমি উত্তর দিলাম,”তোর নিজের শরীরটা দেখছিস পেত্নী হচ্ছিস দিনদিন”। মুখ ভেংচি সোনালী উত্তর দিল…আমার হলেও অসুবিধা নেই। তা বল কি জন্য এই জরুরি তলব, একটু জানতে পারি।” দুজন সাইকেল নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌরসভার পাশের রাস্তা দিয়ে মেইন রোড পার হয়ে নাম নেই সংঘের সামনে একটি গাছের নিচে দাঁড়ালাম। উপরে গাছটির দিকে তাকিয়ে দেখলাম লাল রঙের ছোট ছোট ফুল ফুটেছে । হালকা হওয়ায় মাঝে মাঝে অনেক গুলো ফুল এক সাথে ঝড়ে পরে। তখন ঠিক মনে হত কেউ আমাদের দুজনকে দুর থেকে স্বাগত জানাচ্ছে। একটু এগিয়ে মাঠের এক কোনায় বসলাম তখন বিকেল প্রায় সাড়ে পাঁচটা হবে। দুজনের মধ্যে গল্প শুরু হলো। একসময় সোনালী আমাকে জিজ্ঞাসা করে উঠল শুনেছি ইউনিভার্সিটিতে যারা পরে বা যে ছেলেরা পড়ে তাদের নাকি অনেক গার্লফ্রেন্ড থাকে, তোর আছে নাকি।”

আমি একটু হেসে বললাম ..তুই হবি আমার গার্লফ্রেন্ড ? আজ তোকে এজন্যই ডেকেছি রে। তোর জন্য খুব মন খারাপ করে, তোর কথা সব সময় ভাবতে ইচ্ছে করে। তোকে খুব ভালোবাসি রে। কি করে প্রপোজ করে জানি না। কিন্তু আমার মনের কথা তোকে জানালাম।আর তুই তো আমার বিষয়ে সব জানিস। আর সেই জন্য কিছু বলার নেই রে। কথা গুলো বলার পর আমি আর সোনালীর মুখের দিকে তাকাতে পারলাম না। সূর্য তখন দিগন্ত রেখায়, রক্তিম বর্ণ হয়ে পশ্চিম আকাশে যেন লাল আবির ছড়িয়ে দিয়েছে, আর সেই রক্তিম আভা আমাদের মুখে যেন বসন্তের নতুন প্রেম সঞ্চারিত করেছে। অনেকক্ষণ কেউ কিছু উত্তর দিল না। আমি দেখলাম সোনালী দূরে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবছে। আমার ইচ্ছে হল সোনালীর হাতটা ধরে তাকে আরো কিছু বলবার, কিন্তু আর সাহস হলো না । স্তব্ধতা কাটিয়ে সোনালী বললো, চল, সন্ধ্যা হয়ে আসছে। পাখিরা কিচিরমিচির শব্দ করে যে যার নিজের বাসায় চলল। সজনে ফুলের গন্ধ ভেসে আসতে লাগলো। বাকী রাস্তায় আর কেউ কোন কথা বলল না। শুধু সোনালী যাওয়ার আগে আমি বললাম, কিছু মনে করিস না আমরা কিন্তু বন্ধু এখনো।

পরেরদিন (২৪ ফাগুন বৃহস্পতিবার, ৮ মার্চ )দোল পূর্ণিমা। সকাল হতে সবাই রং খেলতে ব্যস্ত। কালকের কথা গুলো এখন আকাশের বারবার মনে পড়ছে।ভেসে আসছে সোনালীর সেই হাসি মুখ। সকাল হতেই আমি বেরিয়ে পরলাম আমার বন্ধুর বাড়িতে। কারণ স্কুল পড়া থেকে কলেজ পড়া পর্যন্ত আমরা ওই বাড়িতে বেশির ভাগ সময় কাটাতাম। ওই বাড়ি দিনহাটা শহরে। ওর বৌদি আছে। আমরা তাকে প্রত্যেক বার রঙ দিতাম। এককথায় রঙের দিন খুব মজা করতাম। বৌদি আমাদের কথা সব জানত। ওদের বাড়িতে গিয়ে আমি সোনালীকে প্রথমে মিসকল দিলাম। পরে ও মিসকল দিল। আমি ফোন করে বললাম আমি তোমাদের বাড়ির কাছেই আছি। রঙ খেলতে এসেছি তুই আসবি? কলেজ পড়ার সময় যে বাড়িতে এসে দেখা করেছ। ওই বাড়িতে। সোনালী উত্তর দিল আসছি।

বন্ধুর বাড়িতে চুপচাপ বসে আছি। এমন সময় বৌদি তাদের দোকান থেকে ডাকছে মনিরুল দেখ কে এসেছে, বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।” আমি ওপর তলা থেকে দেখলাম সোনালী সাইকেল নিয়ে দাড়িয়ে আছে। ওখান থেকে আমি একটু ব্যাকুল হয়ে বাইরে সোনালীর দিকে তাকিয়ে আছি। পরে ছুটে নেমে এসে সোনালীর কাছে দাঁড়িয়ে বললাম। ভিতরে সাইকেল টা রাখো। সাইকেল টা রেখে কিন্তু কিছু বলার আগেই ব্যাগ থেকে এক মুঠো আবির নিয়ে আমাকে রাঙিয়ে দিল। তারপর আর এক মুঠো আবির নিয়ে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, নে আমার গালে সামান্য আবির লাগিয়ে দে, নয়তো কেউ এসে আমাকে প্রথমে আবির লাগিয়ে দেবে। বাবা মা বার বার বলেছিল আমাদের ধর্মে কোন আবির খেলা জায়েজ নয়। এতে সেরকি গোনা হয়। তাড়াতাড়ি দে আমি বাড়ি যাব। কারণ আমি তো আবির খেলি না। আর আবিরের দিন বাড়ি থেকে বেরোই না। ঠিক আছে আয় ভিতরে। পরে ওকে বন্ধুর ঘরে নিয়ে গেলাম। বন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। পরে সোনালী বললো ফোন করলি তাই আসলাম। তোর হাতে আজ আবির পারবো বলে আসলাম। কারণ আমার পাশের বাড়ির সম্পা বৌদির বাড়িতে বলে এসেছে সোনালী এবার আমাদের সাথে আবির খেলবে। তাই বাড়িতে বৌদির কথা বলে বেড়িয়েছি। তাড়াতাড়ি বাড়ি যাবো। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সোনালীর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

সোনালীর মুখে সেই হাসি লাল টুকটুকে ঠোঁট নাড়িয়ে বলল, নে রে তাড়াতাড়ি পড়া। নয়তো তোর বন্ধু আমায় আবির পড়িয়ে দেবে। এই কথা শুনে বন্ধু বললো না আজ শুধু ওই তোমাকে আবির দেবে। একমুঠো লাল আবির সোনালীর কালো চুলের সিঁথিতে আর লাল টুকটুকে দুই গালে লাল আবির ভরিয়ে দিলাম। জানলা দিয়ে রাস্তায় দেখা যাচ্ছে ছোট ছেলে মেয়েরা নানা রঙের আবির মেখে এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। চারিদিক কেমন যেন খুশিতে ভরে উঠেছে। সোনালী আমাকে জড়িয়ে ধরে চুপি চুপি কানের কাছে বললো, “এভাবে আমার সাথে সারাজীবন থাকিস।” আরে ছাড় রে, এটা তোর বাড়ি নয়, এখন ছাড়। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে রয়েছি। পিছন থেকে বন্ধু এসে নরম সুরে একটা আওয়াজ করলো আমাদের দেখে। হতচকিত হয়ে ও আমাকে সরিয়ে দিলো। পরে ওখানে বসে বন্ধুর সাথে কথা বললো। তারপর সোনালী বললো দুপুর হয়েছে যাব এখন। তারপর তার সাইকেল টা বের করে দিলাম। যাওয়ার সময় বললো আজ বিকেলে পৌরসভার শিশু উদ্যানের ওইখানে দেখা করবো, আর শোন তুই কিন্তু আমার জন্য অপেক্ষা করবি,যেমন টা কলেজ যাওয়ার সময় অপেক্ষা করতিস।

আচ্ছা বাবা আচ্ছা, এই বলে সোনালী একটু ওর বাড়ি কাছাকাছি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এলাম। বিকেল বেলা দুই বন্ধু দুই সদ্য প্রেমিক প্রেমিকা সেই উদ্যানের মাঝখানে একটি শান বাঁধানো জায়গায় রয়েছেন একে অপরের হাত ধরে সুখের গল্প করতে লাগলাম। চারিদিকের থেকে আকাশ বাতাসে ভেসে আসছে রবীন্দ্র সংগীত। আর দক্ষিণ বাতাস আমাদের গা বেয়ে যেন প্রেমের পরশ ছুয়ে দিয়ে যাচ্ছে। সীমাহীন আকাশ, রক্তিম আভার চাদরে মোড়া। মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে কোকিলের কুহুতান। আজ যেন সবাই খুশি। আকাশে বসন্তের গায়ে মেখে একে অপরের সাথে পাশে বসে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু হলো। তাতেই নিমেষে নেমে এলো ঘর অন্ধকার। বাড়ি ফিরেই সোনালী অসুস্থ হয়ে পড়লো। রাত দশটায় জানতে পারলাম। পরে দিন খবর নিলাম তাকে কোচবিহারের একটা বেসরকারি নার্সিং হোমে ভর্তি করা হয়েছে।

দোলের দিন রাতে তার ভাইয়ের কাছে জানতে পারলাম সোনালীর অবস্থা খুব খারাপ। রাত আর ঘুম ধরে না আমার সারা রাত জেগে ছিলাম। তার জন্য খুব কেঁদে ছিলাম, খুব মন খারাপ করেছিল। সেও কি আমার জীবন থেকে সরে যাচ্ছে। পরের দিন সাইকেল নিয়ে কোচবিহারের আমার এক আত্মীয়র বাড়িতে আসলাম। পরে তার সাথে ওই নার্সিং হোম গেলাম দেখা করতে। কিন্তু দুর থেকে দেখলাম একটি কাচের ঘরের ভিতরে তাকে মুখের মধ্যে কি সব লাগিয়ে রেখেছে। তারপর সোনালীর বাবা মার সাথে সাথে কথা বললাম। সেদিন তার বাবা মা কথাই বলতে পারছিল না। বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিল। পরে বাড়ি ফিরে আসলাম।

যদিও মন চাচ্ছে না সেখান থেকে বাড়ি ফিরতে। পরে রাতে সাড়ে ১০ টা নাগাদ খবর এলো সোনালী মারা গিয়েছে। আমি হতবাগ হয়ে গেলাম। কথাবলার ভাষা প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলাম। সারা রাত আর ঘুম এলো না। সারা রাত মনে মনে অনেক কেঁদেছিলাম। আজও ভাবী কেন আসে এই রঙের দিন বসন্ত উৎসব। যে উৎসব ভালোবাসার মানুষে কাছে এনেও তা কেড়ে নিল আমার জীবন থেকে। ‘তবুও ভাবী আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, জীবনও দহনও মাঝে’….।

ডায়েরির পাতায় আমি(মনিরুল) লিখতে লিখতে কেঁদে ফেলি। “শুধু এই জন্ম নয়” আমি প্রতিটা জন্ম তোর সাথে মিশে থাকতে চাই।