বালকের কুয়াশা দিন

161

শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন। বঙ্গজ ঋতুতে শীত একটা বড় ভূমিকা পালন করে। এই শীতের আমেজ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে শীত আতঙ্কও। তবুও শীত শেষেই আসবে বসন্ত। ফুলে ফলে পল্লবিত হবে মানুষের হৃদয়। এই শীতে মানুষ যেন খুঁজে পায় এক অন্য অনুভূতি। শীতের আমেজে রকমারি খাওয়া দাওয়া, রকমারি পোশাক যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে শ্লথ হয়ে যাওয়া কাজের গতিও। সব মিলিয়ে শীত যেন উপভোগেরই।

বছর শেষে ঠাণ্ডার প্রকোপ থাকে বেশী।যেন জাঁকিয়ে শীত। কুয়াশা ভেদ করে বেরাতে যাওয়া থেকে শুরু করে বনভোজন। আহারের নানা বাহার এই সময়েই পেয়ে থাকে এই বাংলার মানুষ। বর্ষবরণের প্রস্তুতি হয় এই সময়েই। সব মিলিয়ে শীত যেন উৎসবের মরসুম। এই শীতে আমাদের ধারাবাহিক প্রতিবেদন “শীতের গীত”। আজ তার তৃতীয় দিন, এই পর্বে লিখেছেন কবি শৌভিক রায়।

শৌভিক রায়

সাত সকাল পেরিয়ে আট বা নয় সকালেও ঝুপি ঝুপি অন্ধকার। তিন হাত দূরের কিছুও দেখা যায় না। মাথা থেকে শুরু করে সর্বাঙ্গ মুড়ে থাকা চেনা লোকও অচেনা একদম। টুপি বা গায়ের চাদরে ফোটা ফোটা জল, অনেকটা যেন স্বেদবিন্দু। কিন্তু এই শীতে ঘাম? এমন সাধ্যি কার! আসলে জলবিন্দু বাতাসে, বাষ্পাকারে। শরীরের সামান্য গরম পেয়ে সেই বাষ্প মুহূর্তে গলে জল, যেন তার রাগ কমল! বার-বাড়ির সামনে স্তুপ করে রাখা খড়ের গাদায় তখন ধোঁয়া উড়ছে। ভেজা ন্যাতানো সেই খড় দেখলে কে আর বলবে যে, গতকাল এই স্তুপের ওপর মজার লাফ লাফিয়ে সারারাত গায়ে চিড়বিড় জ্বলুনি সহ্য করতে হয়েছে! খানিক এগোতেই সাপটানা ব্রিজ থেকে নদীর দিকে তাকালে সাদার পুরু আস্তরণ ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। কোথায় যে নদীর পার আর কোথায় যে জল…যদি জানো তবে ও বালক করো সন্ধান! জানে কেবল পাখিরা, তাই ওই না দেখতে পাওয়া শূন্যে হঠাৎ উড়ে আসা পাখির ডানা থেকে টুপটাপ ঝরে পড়ে জল। স্নান করেছে পাখি? না। মিটিয়েছে তৃষ্ণা।

এ এক এমন জৈবিক প্রবৃত্তি যে ঋতু মানে না, দিন মানে না। আসলে তৃষ্ণা তো সর্বব্যাপী, সর্বকালীন…কার তৃষ্ণা কবে আর মিটেছে। মিটলে অবশ্য সব ফুরিয়ে গেল, তাই মেটে না। অবশ্য কাল সারারাত টিনের চালে শোনা গেছে এই জলতরঙ্গ। ঠান্ডা লেপ আর কম্বলে মড়ার মতো পড়ে থেকে ঘুম আর ঘুম আর কানে কেবল জল-গান, একান্ত নিজস্বতা আর হারিয়ে যাওয়া গভীর সুপ্তিতে। অন্ধকার সকালে ঠাহর করাই দায় কখন যে দিন শুরু হয়ে গেছে! চা-বাগানের দিকে খানিকটা পরিষ্কার। বালক দেখে পুনম, রজনী, মারিয়ারা পাতা তুলতে শুরু করেছে। এই শুখা সময়ে পাতা আর কোথায়! খানিক বাদেই তো স্প্রে মেশিনে জল ছেটানো হবে বাগানে। তবু ওরা পাতা তোলে। ওই পাতা ওজন হবে, ওরা মজুরি পাবে। সেই মজুরিতে চাল কেনা হবে, কেনা হবে কিছু সবজি।

লাকড়ির উনুন জ্বলবে আর উনুনের সাদা ধোঁয়ায় মিশে যাবে এই মুহূর্তের ধোঁয়া ধোঁয়া এই সকাল। মংলু বা সোমরাকে নিয়ে ওরা যখন খেতে বসবে তখন কি ওদের মনে হবে যে, এই সাদা সকাল মিলে গেল সাদা ভাতে…বালক ভাবে। অন্যদিকে অদেখা সাদা রং লেগে থাকা সেই সবুজ চা-পাতা থেকে লাল চা তৈরী হয়ে যখন শহুরে বাবু পেয়ালায় চুমুক দেবেন তখন তিনি বুঝতেও পারবেন না যে, ওই চায়ে লেগে আছে সাদা রং আর কুয়াশা গন্ধ!

কুয়াশা…কোহরা। বালকের শীত-সকালের নিজস্ব সঙ্গী। গত রাত থেকেই এই বন্ধুকে নিয়ে বালক কাটিয়েছে দীর্ঘ সময়। কুয়াশা আজও তাকে ঘিরে। হৈ হৈ কুয়াশার এই শীত সকাল কখন যে গুটিগুটি পায়ে সাবালক হয়ে গেছে বালক নিজেও বোঝেনি। ঝমঝম ট্রেন কুয়াশা মেখে দক্ষিণ মুখে চলে গেলে টের পাওয়া গেল সকাল তখন দিন। ট্রেনের জানালাগুলো আষ্টেপৃষ্টে বন্ধ, তাতে বালক দেখে নিজের মুখ। সেটে রয়েছে সে মুখ আর সেই বালকের চোখে টানটান দৃষ্টি কুয়াশা ছাড়িয়ে অন্য কোনো অজানায়। শীতের ধুলো-চাদরেও এতক্ষনে ভেজা ভেজা ভাব। তাতে পা রাখতেই চিহ্ন। তবে বালক জানে এই চিহ্ন চলে যাবে আর কদিন পরের বসন্ত-হাওয়ায়। আসলে চিহ্ন রাখতে হলে রাখতে হয় মনের অলিন্দে, কোনো বাতাস যেখানে প্রবেশ করতে পারে না, কোনো কুয়াশা যেখানে জমে না।

কুয়াশা দুপুর একটু তরতাজা। সেই নিস্তেজ ভাবটা আর নেই। কখনো মেঘের ফাঁকে এক চিলতে আলো দেখা গেলেও নিমেষে সে গায়েব। দূরের ওই প্রান্তরে, ইজেলের ওপরের দিকে এক পোচ রং বোলানোর মতো, সাদা কুয়াশা একটু উঁচুতে ভেসে বেড়াচ্ছে। হলুদ মাঠের ওপরে সেই সাদা…বালক চেয়ে থাকে শুধু, আশ মেটে না তার। রাস্তার কলের ঝরতে থাকা জলে তখনও সাদা ধোঁয়া ওঠে, তেল মেখে টুক করে সেরে নেয় স্নান কেউ। নিঃশব্দ দুপুরে আবারও জল-শব্দ। তবে এবার তরঙ্গ নয়, এক নাগাড়ে বয়ে চলার আওয়াজ। বালকের মনে হয়, জীবন এরকমই। জীবনের প্রবাহ এভাবেই এক নাগাড়ে বয়ে চলে, তরঙ্গ কেবল ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে।

দ্রুত চলে যাওয়া দুপুর ঝপ করে পাল্টে যায় কুয়াশা সন্ধ্যায়। বেজে ওঠে মঙ্গলধ্বনি, কুয়াশা ভেদ করে দেখা যায় দীপমালা। অবশেষে আলো। আলো জীবনের, আলো বয়ে চলার। কুয়াশা দিন শেষ হয় আর একটা কুয়াশা দিনের অপেক্ষায়। বালক জানে, কুয়াশা মানেই আলো। কুয়াশা মানেই প্রত্যাশা। কুয়াশা মানেই নতুনের সম্ভাবনা।