১৫২৮-২০২০ ফিরে দেখা ইতিহাস,বাবরি মসজিদ-রাম মন্দির বিতর্ক

488
মনিরুল হক

সেজে উঠেছে অযোধ্যা। ঝকঝকে রাস্তা। অনেক রাস্তা চওড়া হয়েছে। নতুন করে পিচ পড়েছে। চারদিকে পতাকা, ব্যানার, ফেস্টুন। রাতে সরযূর তীরে বাড়ি ও মন্দির নানা রঙ দিয়ে সাজানো হয়েছে। অন্য তীর থেকে দেখলে বোঝা যায়, কতটা রঙিন করে তোলা হয়েছে অযোধ্যাকে।

রামমন্দিরের ভূমিপুজোর চূড়ান্ত অনুষ্ঠান হবে আগামী ৫ অগাস্ট। ভূমিপুজোর সূচনা অবশ্য হয়ে যাবে ৩ অগাস্ট থেকে। ৪ তারিখ রামের পুজো হবে। কিন্তু সেখানেই করোনার হানা। এই পুজো করার কথা বারাণসী ও অযোধ্যার পুরোহিতদের। অনুষ্ঠানের আগে সকলের করোনা পরীক্ষা হচ্ছে। সেখানেই ধরা পড়েছে, রামলালার মন্দিরের প্রধান পুরোহিত সত্যেন্দ্র দাসের সহকারী পুরোহিত প্রদীপ দাস করোনায় আক্রান্ত। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে আইসোলেশনে পাঠানো হয়েছে। শুধু তিনিই নন, করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন নিরাপত্তায় দায়িত্বে থাকা ১৫ জন পুলিশ কর্মী।  

আগামী ৫ অগাস্টের অনুষ্ঠানে সত্যেন্দ্র দাসই প্রধান পুরোহিতের ভূমিকায় থাকবেন। তার আগে প্রদীপ দাসের করোনা ধরা পড়ায় রীতিমতো আলোড়ন শুরু হয়ে গিয়েছে অযোধ্যায়। দিন ছয়েক আগে প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ অযোধ্যায় গিয়েছিলেন। তিনি রামলালার পুজো দেন। সেখানেও প্রদীপ ছিলেন।

তবে প্রশাসন জানিয়েছে, প্রদীপের সঙ্গে থাকা বাকিদের করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট এসে গেছে। তাঁরা কেউই করোনায় আক্রান্ত নন। তবে প্রশাসন কোনো ঝুঁকি নিচ্ছে না। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেক ভিভিআইপি থাকবেন, তাই দরকারে আবার করোনা পরীক্ষা করে দেখা হতে পারে।

করোনা নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক একটা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর(এসওপি) ঘোষণা করেছে। সেই এসওপি-তে বলা হয়েছে, ‘‘৬৫ বছরের বেশি বয়সের ব্যক্তি, যাঁদের অন্য গুরুতর অসুখ আছে, গর্ভবতী মহিলা এবং ১০ বছরের কম বয়সী বাচ্চারা বাড়িতে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।” ধর্মীয় বিষয় যাঁরা সংগঠন করছেন, তাঁদেরও এই পরামর্শ মাথায় রাখার কথা বলা হয়েছে। আনলক ৩-এর নীতি নির্দেশিকা সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানেও একই পরামর্শ বহাল রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বয়স ৬৯ বছর। লালকৃষ্ণ আডবাণী আর কয়েক মাস পরে ৯৩-এ পা দেবেন। মুরলী মনোহর জোশীর বয়স  ৮৬, আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের ৬৯, বিজেপি নেতা ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং-এর ৮৮, আরএসএস নেতা ভাইয়াজি জোশীর ৭৩ বছর বয়স। তা হলে তো কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের এসওপি মানলে তাঁদের বাড়িতে থাকা উচিত। রামমন্দিরের ভূমিপুজোর অনুষ্ঠানে যাওয়া উচিত নয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রকের এই এসওপি প্রথম জারি করা হয়, আনলক ১-এর সময়। তারপর থেকে তা এখনও পর্যন্ত বহাল রাখা হয়েছে। গত ১০ জুন সাংবাদিক সম্মেলনে স্বাস্থ্য মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব লব আগরওয়াল বলেছিলেন, ‘‘এসওপি জারির পিছনে আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো করোনার সংক্রমণ রোধ করা। তাই সেখানে সামাজিক দূরত্ব সহ সব বিষয়ই আছে।”

করোনার মধ্যেই রামমন্দিরের ভূমিপুজো নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। প্রবীণ রাজনীতিক শরদ পাওয়ার বলেছেন, করোনার সংক্রমণ রোধ করাই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল। এই অবস্থায় সরকারের জারি করা এসওপি বিড়ম্বনায় ফেলেছে বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বকে।

  • বাবরি মসজিদ: প্রতিষ্ঠা, ভাঙচুর, মামলা, রায়ঃ

রামায়ণ-খ্যাত অযোধ্যা শহর উত্তর প্রদেশ রাজ্যের ফৈজাবাদ জেলায় অবস্থিত৷ তারই কাছে রামকোট পর্বত৷ ১৫২৮ সালে সেখানে সম্রাট বাবরের আদেশে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়, যে কারণে জনমুখে মসজিদটির নামও হয়ে যায় বাবরি মসজিদ৷ আবার এ-ও শোনা যায়, গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকের আগে এই মসজিদ ‘মসজিদ-ই-জন্মস্থান’ বলেও পরিচিত ছিল৷

১৫২৮: কিছু হিন্দুদের মতে, হিন্দুধর্মের অন্যতম আরাধ্য দেবতা রাম যেখানে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন সেখানে একটি মসজিদ তৈরি করা হয়।

১৮৫৩: ধর্মকে কেন্দ্র করে প্রথমবারের মত সহিংসতার ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়।

১৮৫৩: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন দুই ধর্মের উপাসনার জায়গা আলাদা করার উদ্দেশ্যে বেষ্টনী তৈরি করে। বেষ্টনীর ভেতরের চত্বর মুসলিমদের জন্য এবং বাইরের চত্বর হিন্দুদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত হয়।

১৯৪৯: মসজিদের ভেতর রামের মূর্তি দেখা যায়। হিন্দুদের বিরুদ্ধে মূর্তিগুলো রাখার অভিযোগ ওঠে। মুসলিমরা প্রতিবাদ জানায় এবং দুই পক্ষই দেওয়ানি মামলা করে। সরকার ওই চত্বরকে বিতর্কিত জায়গা বলে ঘোষণা দেয় এবং দরজা বন্ধ করে দেয়।

১৯৮৪: বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) নেতৃত্বে ঈশ্বর রামের জন্মস্থান উদ্ধার এবং তার সম্মানের একটি মন্দির প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করে হিন্দুরা। তৎকালীন বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি (পরবর্তীতে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) ওই প্রচারণরা নেতৃত্ব নেন।

১৯৮৬: জেলার বিচারক আদেশ দেন যেন বিতর্কিত মসজিদের দরজা উন্মুক্ত করে দিয়ে হিন্দুদের সেখানে উপাসনার সুযোগ দেওয়া হয়। মুসলিমরা এর প্রতিবাদে বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটি গঠন করে।

১৯৮৯: বিতর্কিত মসজিদ সংলগ্ন জায়গায় রাম মন্দিরের ভিত্তি স্থাপান করে নতুন প্রচারণা শুরু করে ভিএইচপি।

১৯৯০: ভিএইচপি’র কর্মীরা মসজিদের আংশিক ক্ষতিসাধন করে। প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখর আলোচনার মাধমে বিতর্ক সমাধানের চেষ্টা করলেও তা পরের বছর বিফল হয়।

১৯৯১: অযোধ্যা যে রাজ্যে অবস্থিত, সেই উত্তর প্রদেশে ক্ষমতায় আসে বিজেপি।

১৯৯২: ভিএইচপি, বিজেপি এবং শিব সেনা পার্টির সমর্থকরা মসজিদটি ধ্বংস করে। এর ফলে পুরো ভারতে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে হওয়া দাঙ্গায় ২ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়।

১৯৯৮: প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির অধীনে জোট সরকার গঠন করে বিজেপি।

২০০১: মসজিদ ধ্বংসের বার্ষিকীতে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ওই স্থানে আবারো মন্দির তৈরির দাবি তোলে ভিএইচপি।

জানুয়ারি ২০০২: নিজের কার্যালয়ে অযোধ্যা সেল তৈরি করেন প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ি। সিনিয়র কর্মকর্তা শত্রুঘ্ন সিংকে নিয়োগ দেওয়া হয় হিন্দু ও মুসলিম নেতাদের সাথে আলোচনার জন্য।

ফেব্রুয়ারি ২০০২: উত্তর প্রদেশের নির্বাচনের তফসিলে মন্দির তৈরির বিষয়টি বাদ দেয় বিজেপি। ভিএইচপি ১৫ই মার্চের মধ্যে মন্দির নির্মানকাজ শুরু করার ঘোষণা দেয়। শত শত স্বেচ্ছাসেবক বিতর্কিত স্থানে জড়ো হয়। অযোধ্যা থেকে ফিরতে থাকে হিন্দু অ্যাক্টিভিস্টদের বহনকারী একটি ট্রেনে হামলার ঘটনায় অন্তত ৫৮ জন মারা যায়।

মার্চ ২০০২: ট্রেন হামলার জের ধরে গুজরাটে হওয়া দাঙ্গায় ১ হাজার থেকে ২ হাজার মানুষ মারা যায়।

এপ্রিল ২০০২: ধর্মীয়ভাবে পবিত্র হিসেবে বিবেচিত জায়গাটির মালিকানার দাবিদার কারা, তা নির্ধারণ করতে তিনজন হাইকোর্ট বিচারক শুনানি শুরু করেন।

জানুয়ারি ২০০৩: ওই স্থানে ইশ্বর রামের মন্দিরের নিদর্শন আছে কিনা, তা যাচাই করতে আদালতের নির্দেশে নৃতত্ববিদরা জরিপ শুরু করেন।

অগাস্ট ২০০৩: জরিপে প্রকাশিত হয় যে মসজিদের নিচে মন্দিরের চিহ্ন রয়েছে, কিন্তু মুসলিমরা এই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। হিন্দু অ্যাক্টিভিস্ট রামচন্দ্র পরমহংসের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ি বলেন, তিনি মৃত ব্যক্তির আশা পূরণ করবেন এবং অযোধ্যায় মন্দির তৈরি করবেন। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে আদালতের সিদ্ধান্তে এবং আলোচনার মাধ্যমে এই দ্বন্দ্বের সমাধান হবে।

সেপ্টেম্বর ২০০৩: বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পেছনে উস্কানি দেওয়ায় সাত জন হিন্দু নেতাকে বিচারের আওতায় আনা উচিত বলে রুল জারি করে একটি আদালত। তবে সেসময়কার উপ-প্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানির – যিনি ১৯৯২ সালে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন- বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি।

অক্টোবর ২০০৪: বিজেপি নেতা আদবানি জানান তার দল এখনও অযোধ্যায় মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তা ‘অবশ্যম্ভাবী।

নভেম্বর ২০০৪: উত্তর প্রদেশের একটি আদালত রায় দেয় যে মসজিদ ধ্বংস করার সাথে সম্পৃক্ত না থাকায় মি. আদবানিকে রেহাই দিয়ে আদালতের জারি করা পূর্ববর্তী আদেশ পুনর্যাচাই করা উচিত।

জুলাই ২০০৫: সন্দেহভাজন ইসলামি জঙ্গীরা বিস্ফোরক ভর্তি একটি জিপ দিয়ে বিতর্কিত স্থানটিতে হামলা চালিয়ে সেখানকার চত্বরের দেওয়ালে গর্ত তৈরি করে। নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী’র হাতে নিহত হয় ছয়জন, যাদের মধ্যে পাঁচজনই জঙ্গি বলে দাবি করে নিরাপত্তা রক্ষীরা।

জুন ২০০৯: মসজিদ ধ্বংস হওয়া সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে থাকা লিবারহান কমিশন তদন্ত শুরু করার ১৭ বছর পর তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।

নভেম্বর ২০০৯: প্রকাশিত লিবারহান কমিশনের প্রতিবেদনে মসজিদ ধ্বংসের পেছনে বিজেপি’র শীর্ষ রাজনীতিবিদদের ভূমিকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয় এবং এনিয়ে সংসদে হট্টগোল হয়।

সেপ্টেম্বর ২০১০: আল্লাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দেয় যে স্থানটির নিয়ন্ত্রণ ভাগাভাগি করে দেওয়া উচিত। কোর্টের রায় অনুযায়ী এক-তৃতীয়াংশের নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের, এক-তৃতীয়াংশ হিন্দুদের এবং বাকি অংশ ‘নির্মোহী আখারা’ গোষ্ঠীর কাছে দেওয়া উচিত। যেই অংশটি বিতর্কের কেন্দ্র, যেখানে মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিল, তার নিয়ন্ত্রণ দেয়া হয় হিন্দুদের কাছে। একজন মুসলিম আইনজীবী বলেন যে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।

মে ২০১১: ২০১০ সালের রায়ের বিরুদ্ধে হিন্দু ও মুসলিম দুই পক্ষই আপিল করায় হাইকোর্টের পূর্ববর্তী রায় বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট।

নভেম্বর ২০১৯: সে জায়গাটিতে মন্দির তৈরির পক্ষেই চূড়ান্ত রায় দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। মসজিদ বানানোর জন্য অযোধ্যারই কোনও উল্লেখযোগ্য স্থানে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডকে পাঁচ একর জমি দিতে হবে। এই মন্দির ও মসজিদ বানানোর জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে একটি ট্রাস্ট গঠনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অযোধ্যার যে ২.৭৭ একর জমিকে বিরোধের মূল কেন্দ্র বলে গণ্য করা হয়, তার মালিকানা দেওয়া হয়েছে ‘রামলালা বিরাজমান’ বা হিন্দুদের ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের শিশুরূপের বিগ্রহকে। যার অর্থ সেখানে রামমন্দিরই তৈরি হবে।

ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ-র নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ এদিন সর্বসম্মতিক্রমে এই রায় দেয়। এর আগে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতে বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিজেপির শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতেই উগ্র কট্টরপন্থী বিভিন্ন হিন্দু সংগঠনের সদস্যরা অযোধ্যার ওই বিতর্কিত জমির ওপর অবস্থিত বাবরি মসজিদের স্থাপনাটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। বাবরি মসজিদ ভাঙার পর ভারতের নানা প্রান্তে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল তাতে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

বাররি মসজিদ তথা বিতর্কিত রাম মন্দিরের রায় ঘোষণার সময় বিচারপতিরা ভারতের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের (আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া) একটি রিপোর্টও উল্লেখ করেছেন, যাতে বলা হয়েছিল বাবরি মসজিদের নিচে একটি স্থাপনা ছিল বলে প্রমাণ মিলেছে-তবে সেই কাঠামোটি ঠিক কীসের তা স্পষ্ট নয়।

ভারতে ঐতিহাসিকরা মোটামুটি একমত যে, মুঘল আমলে বাবরের একজন সেনাপতি মীর বাঁকি ১৫২৮ সাল নাগাদ অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে দেশের হিন্দু সমাজের একটা বড় অংশ বিশ্বাস করেন, তাদের আরাধ্য দেবতা শ্রীরামচন্দ্রের জন্মস্থানের ওপরই ওই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। ভারতের ধর্মীয়-রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে বহু দশক ধরে সবচেয়ে বিতর্কিত ও রক্তক্ষয়ী ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত হয়ে এসেছে এই বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভূমি বিরোধ। শীর্ষ আদালতের মাধ্যমে সেই বিরোধের নিষ্পত্তির লক্ষ্যেই সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ শনিবার এই রায় ঘোষণা করে।

ওই রায় ঘোষণার পর অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের সদস্য জাফরিয়াব জিলানি জানিয়েছেন, এই রায়ের মধ্যে অনেক ‘স্ববিরোধিতা’ ও ‘তথ্যগত ভুল’ আছে বলে তারা মনে করছেন।

“আমরা এখন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে স্থির করব আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে। সবাই একমত হলে আমরা রিভিউ পিটিশন দাখিল করব”, জানিয়েছেন তিনি। এদিকে বিভিন্ন হিন্দু সংগঠন এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলে বর্ণনা করে একে স্বাগত জানিয়েছে।

ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও শীর্ষস্থানীয় বিজেপি নেতা রাজনাথ সিং এদিনের রায়কে ‘ল্যান্ডমার্ক জাজমেন্ট’ বলে বর্ণনা করেছেন। দেশবাসীকে তিনি শান্তি ও সুস্থিতি বজায় রাখারও আহ্বান জানিয়েছেন।

সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চে এর আগে টানা চল্লিশ দিন ধরে এই মামলার শুনানি হয়েছে। প্রধান বিচারপতি ছাড়া বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা ছিলেন এস এ বোডবে, ওয়াই ভি চন্দ্রচূড়, অশোক ভূষণ ও এস আবদুল নাজির। অযোধ্যার বিতর্কিত ধর্মীয় স্থানটি যে উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে, সেখানে ইতিমধ্যেই নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বারো হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

ওই রায় ঘোষণার আগে প্রধান বিচারপতি গগৈ রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উত্তরপ্রদেশের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন। উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ, কর্নাটক ও রাজস্থান-সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে আজ স্কুল-কলেজ সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ রাখা হয়েছে।

রায় ঘোষণার আগের রাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী টুইট করে বলেছিলেন, “অযোধ্যার রায় কারও জয় বা কারও পরাজয় সূচিত করবে না।” “দেশের সামনে এই মুহুর্তে অগ্রাধিকার হল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা”, এ কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি।

তবে ওই রায় ঘোষণার ঠিক পর পরই তিনি পাঞ্জাবে ভারতের দিক থেকে ভারত-পাকিস্তান যৌথ উদ্যোগে নির্মিত কর্তারপুর করিডরের উদ্বোধন করেন। কিন্তু সেখানে তার ভাষণে তিনি অযোধ্যা রায়ের প্রসঙ্গ একেবারেই তোলেননি।

সেজে উঠেছে অযোধ্যা

৩-৫ আগস্ট ২০২০ঃ অযোধ্যায় রামমন্দিরের জন্য ভূমিপুজোর কাজ শুরু হবে আগামী ৩ অগাস্ট। ভূমিপুজো হবে ৫ অগাস্ট। সে দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অযোধ্যায় উপস্থিত থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই প্রথম অযোধ্যায় রাম জন্মভূমিতে পা রাখবেন মোদী।

রামজন্মভূমি ট্রাস্টের তরফে জানানো হয়েছে, বারণসীর পুরোহিতরা ভূমিপুজোর দায়িত্বে থাকবেন। তাঁদের সঙ্গে থাকবেন অযোধ্যার পুরোহিতরাও। ভূমিপুজোর দিন গর্ভগৃহে পাঁচটি রুপোর ইট রাখা হবে। গর্ভগৃহ হবে আটকোণা। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ মন্দিরের যে নকশা বানিয়েছিল, মূলত তাকেই অনুসরণ করা হচ্ছে, তবে তা আরও বড় করা হয়েছে। তিনটি গম্বুজের জায়গায় পাঁচটি গম্বুজ থাকবে। মন্দিরের আয়তন হবে প্রায় ৮৪ হাজার বর্গফুট।

প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, সেই সঙ্গে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে অমিত শাহ, মোহন ভাগবত, নীতীশ কুমার, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে সহ প্রায় শতিনেক অভ্যাগতকে। তবে উদ্ধব যাবেন কি না, তা জানা যায়নি।

কিন্তু এই করোনাকালে রামমন্দির নির্মাণ শুরু করে দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন প্রবীণ রাজনীতিক শরদ পাওয়ার। তিনি বলেছেন, ”কোন কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সেটা আগে ঠিক করতে হয়। এখন যেমন করোনাকে থামানো এবং অর্থনীতির হাল ফেরানোর কাজটাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কিছু লোক হয়ত ভাবেন, মন্দির তৈরি করলে করোনা সেরে যাবে। কিন্তু আমাদের কাছে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই ও অর্থনীতির হাল ফেরানো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

এর জবাবে বিজেপি-র মুখপাত্র সুদেশ বর্মা ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন, ”করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সঙ্গে রামমন্দিরনির্মাণের তুলনা হওয়া উচিত নয়। এখন আনলক-পর্ব শুরু হওয়ার পর সবকিছুই খুলে গিয়েছে। পুজো এবং উপাসনা চালু হয়েছে। সরকার করোনার সঙ্গে লড়াই করছে এবং সফল হয়েছে। দিল্লি ও মুম্বইতে করোনার প্রকোপ কমেছে। বাকি জায়গাতেও কমবে। এর পাশাপাশি রামমন্দিরের ভূমিপুজো হতে অসুবিধা কোথায়? পুরোহিতরা এই সময় ঠিক করেছেন। তা নিয়ে বিতর্ক অনর্থক।”

তবে অগাস্টের পাঁচ তারিখ ভূমিপুজো করার মধ্যে অন্য একটা বার্তা আছে বলে মনে করেন প্রবীণ সাংবাদিক শরদ গুপ্তা। ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেছেন, ”ঠিক এক বছর আগে ৫ অগাস্ট কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এক বছর পরে আবার রামমন্দিরের ভূমিপুজো হচ্ছে। তার থেকে মনে হচ্ছে, ৫ অগাস্ট দিনটা ভেবেচিন্তেই বেছে নেওয়া হয়েছে।”

এতদিনে একটা কথা পরিষ্কার, মোদী-শাহ সবসময়ই একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করেন। তাঁরা অনেকদূর পর্যন্ত ভেবে রাখেন। বিজেপি সূত্র জানাচ্ছে, এই দিন ঠিক করার ক্ষেত্রেও বড় রাজনৈতিক পরিকল্পনা রয়েছে। আর কয়েক মাস পরে বিহারে বিধানসভা ভোট। সামনের বছর পশ্চিমবঙ্গে। আর রামমন্দির তৈরি হতে তিন থেকে সাড়ে তিন বছর লাগবে। যখন রামমন্দির শেষ হবে, লোকের জন্য খুলে যাবে, তখন  লোকসভা নির্বাচন এসে যাবে। রামমন্দির তাঁদের বিধানসভা তো বটেই, লোকসভাতেও জেতার ক্ষেত্রে বড় অস্ত্র হবে বলে বিজেপি নেতাদের আশা।

তবে শরদ মনে করেন,”বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরেই তো অযোধ্যায় রামমন্দির ছিল। সেই মন্দির এবার বিশাল করে গড়ে উঠবে। সেটা রামভক্তদের কাছে শ্লাঘার বিষয় হতে পারে, কিন্তু তার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সম্ভবত খুব বেশি হবে না। সেটা আর ভাবাবেগের ঘটনা হয়ে উঠবে না। মনে রাখবেন বাবরি ধ্বংসের এক বছর পর উত্তর প্রদেশে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি হেরেছিল।”

বিজেপি নেতাদের অবশ্য দাবি, উত্তর ভারতে যদি রামমন্দিরের প্রভাব না পড়ে তো কীসে পড়বে? মোদী ক্ষমতায় আসার পর তিন তালাক বন্ধ করেছেন, ৩৭০ ধারা বিলোপ করেছেন, এবার রামমন্দিরও হচ্ছে। এর মধ্যে অভিন্ন দেওয়ানী বিধি যদি হয়ে যায়, তা হলে তো কথাই নেই। জেতার জন্য এটাই যথেষ্ট।

একসময় রামরথের সওয়ার হয়েই নিজেদের জনপ্রিয়তা হু হু করে বাড়িয়ে নিয়েছিল বিজেপি। এখন আবার রামমন্দিরে সওয়ার হয়ে তারা একের পর এক নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চায়। সেই সঙ্গে আবার সেই স্লোগানটা উঠবে, মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়, মানে মোদী থাকলে সবই সম্ভব। রামমন্দির তৈরি শুরু হওয়ার পর সেই সম্ভবের তালিকায় রামমন্দিরও সম্ভবত যোগ করবে বিজেপি।