আমি দিনহাটার নির্ভয়া, এবার নিজেই কলম ধরলেন ধর্ষিতা শিক্ষিকা

12879

দিনহাটার নির্ভয়া, একজন  শিক্ষিকা। না আমাকে গ্যাংরেপ করে খুন করার চেষ্টা হয় নি। দিল্লীর নির্ভয়ার মত দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয় নি। কিন্তু বিশ্বাস করুন যন্ত্রনায় হয়ত খুব বেশী তফাৎ নেই। এই যন্ত্রনা মানসিক ভাবে সত্যি সত্যি মৃত্যুর মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আমাকে।

সে যাক এখন আসি আমার কথায়। আমি একজন শিক্ষিকা। দিনহাটা ৭ নং ওয়ার্ড  নিবাসী। আমার স্বামী  দিনহাটা হাইস্কুলের শিক্ষক। ৭ বছরের পুত্র সন্তানকে নিয়ে আমাদের সংসার। এই অব্দি জীবনের গল্পটা একেবারেই স্বচ্ছন্দ স্বাভাবিক। চরম পর্যায়ের মূল্য দিলাম মানুষকে আপন ভেবে, বিশ্বাস করে, পারিবারিক বন্ধু ভেবে। পড়েছিলাম, শিখেছিলাম যে “মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ!” এটাও শিখেছিলাম যে, ” মানুষ মানুষের জন্য!”…… অথচ বাস্তবটা সেই বিশ্বাসই এক ঝটকায় আমার জীবনটা এক্কেবারে বদলে দিলো!

কেনো এলাম আপনাদের সামনে জানেন। প্রথমত, আগামীতে কি শেখাবো আমি আমার ছাত্র ছাত্রীদের যদি নিজের সন্মানের জন্য লড়াইটাই না করতে পারি? গত তিনদিন হলো আমার ঘটনাটা আপনাদের সামনে! কিন্তু যে বিষয়টা আমার ও আমাদের কাছে একেবারেই স্বচ্ছ নয় বলে আজ আপনাদের মুখোমুখি হতে হলো আমাকে, সেটিও জানাই।

এই দেশটা আমার। আমি এই দেশের, এই মাটির কন্যা। সেই অধিকারে আপনাদের বলছি…..এই দেশ, দেশের ইতিহাস, গল্প সাহিত্য নাটকে নভেলে সোশাল মিডিয়ায় নারীকে তো আপনারা ঈশ্বর আল্লার পর্যায়ে নিয়ে গেছেন কিন্তু বাস্তবটা হলো একজন নারী, একজন মা, একজন স্ত্রী, দেশের একজন সাধারণ মানুষ আমি, ধর্ষনের শিকার হয়ে পুলিশ প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়িয়েছি, বেড়াচ্ছি আমার মুখটা না ঢেকে! কারন আমি অন্যায় করিনি। আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করে শুধু ন্যায় চেয়েছি। আজ অব্দি প্রশাসন কি ব্যাবস্থা গ্রহণ করেছে আপনারা জানেন কিছু?????? আমি এখনো জানিনা।

না আমি জানিনা। কারন কোন ব্যাবস্থাই গ্রহন হয়নি। উলটে আমার ও আমাদের বিরুদ্ধে অভিযুক্তর পরিবার থানায় পাল্টা কেস দিয়েছে এবং পুলিশ তা গ্রহনও করেছে! আজ যখন চরম মানসিক যন্ত্রনায়, অবসাদে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমরা মহিলা থানায় সোশাল ডিস্ট্যান্স মেনে শান্তিপূর্ণ  অবস্থান করবো তখন উলটে আমাকেই এরেস্ট করা হবে বলে একরকম হুমকি দেওয়া হল! অথচ ধর্ষণের শিকার হয়ে প্রথম এফআইআরটা কিন্তু প্রথমে আমিই করেছি। কোন সুস্থ মানুষের বুঝতে এতোটুকু অসুবিধে হওয়ার কথা নয় যে, পরবর্তীতে অভিযুক্তর স্ত্রী দ্বারা করা অভিযোগটা কতটা মনগড়া ও ভিত্তিহীন। 

এই আপনাদের ন্যায়? কখন একজন ধর্ষিতা নারী, অত্যাচারিত শিক্ষিকা বা একজন শিক্ষক স্বামী তার ধর্ষিতা  স্ত্রীকে নিয়ে রাস্তায় নামে ন্যায়ের আশায়, বুঝতে পারেন আপনারা? ভাবতে পারেন সেই স্বামীর মানসিক যন্ত্রনাটা? ভাবতে পারেন,  কিভাবে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আমাদের??? ভেবেছেন সেই ছোট্ট সন্তানের কথা? যে নিজের মা’র অসহায়তা চোখের সামনে দেখছে, কিন্তু অপারগ????? এই সমাজ থেকে কি শিক্ষা, নীতিকে সম্বল করে সে বড় হবে?

সোশাল মিডিয়ায় আমার স্বামী, সমাজের সকল ছাত্র, শিক্ষক, নাগরিক সমাজ, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রতিটি মানুষের কাছে আবেদন রেখেছেন আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবার! আজ অব্দি কি ব্যাবস্থা নেওয়া হয়েছে?????

আমি ভীতু হতে পারিনি। তাই লড়াইটা লড়তে নেমেছি, লড়বো! রাস্তায় অভিযুক্তর পরিবার দ্বারা নিগৃহীত, লাঞ্চ্ছিতো হয়েছি। আমাদের সমাজ, পাড়ার লোক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে!আর কি খেসারত বা মূল্য চোকাতে হবে আমি জানিনা। গত দুদিন ধরে প্রশাসনের কাছ থেকে কোন সদর্থক বার্তা আমি পাইনি। কি করবো? ছেড়ে দেবো আত্মসন্মানের লড়াই এই ভেবে যে আমি ক্ষমতাবান নই কারন আমার কাছে অঢেল টাকা বা  রাজনৈতিক পদ নেই???? আইন কি তবে শুধু ক্ষমতাবান টাকাওয়ালাদের জন্য? আইন কি তবে শুধুই রঙ, অর্থ দেখতে অভ্যস্ত? একজন মহিলার সন্মানের কোন মূল্য নেই এই সমাজে?

অনেকেই চটুল কথা, রসিকতা, চরিত্র নিয়ে কাটাছেঁড়া, ছবি দিয়ে রিসার্চে নামছে আমি জানি। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছেন যে আজ আমি, কাল কে???? কন্যা, স্ত্রী, মা তো আপনাদের ঘরেও আছে! একবারও তাদের মুখের দিকে তাকিয়েও মনে হচ্ছেনা যে কতোটা অসহায় আমি? আমার পরিবার????শ্রদ্ধা রেখেই তাদের বলছি,যে সময়টা আপনারা অনেকেই আমাকে না জেনেই আমার বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন ন্যারেটিভ নামিয়ে ব্যয় করছেন! প্লিজ একবার আমার অন্তরের আওয়াজটাও শুনুন। কেউ নিজেকে ধর্ষিতা পরিচয় দিয়ে গৌরব বোধ করেনা। বরং যেটা অনেকে পারেননি কিন্তু আমি চেষ্টা করছি…..প্রতিবাদ, প্রতিরোধটুকু করতে! এই যদি হয় আপনাদের সুশীলতা তাহলে আমার মেরুদণ্ডটাকে অন্ততপক্ষে ভেঙে দেবেন না! একান্ত অনুরোধ আপনাদের কাছে! আল্লা করুন এই ভয়ংকরতম পরিস্থিতিতে কাউকেই যেন কক্ষনো পরতে না হয়।

অনেক শক্তি, সাহস সঞ্চয় করে আমি লড়াইটা লড়বো। আপনারা আমার পাশে থাকবেন এটুকু আশা রাখি। স্ত্রীর অনিচ্ছায় স্বামীর জোরপূর্বক সহবাস বা অর্থের বিনিময়ে শরীর বিক্রি করা মেয়েটিকে বাধ্য করা সবটাই তো ধর্ষণ। তাই আজ একজন নারী, একজন মা, একজন শিক্ষিকা, একজন স্ত্রী প্রকাশ্যে আপনাদের সুশীল সমাজকে প্রশ্ন রাখছে, প্রতিবাদ করে কি আমি ভুল করেছি? লড়াইটা কি আমি লড়বো না? অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জন্য আমি ভারত মায়ের কন্যা হয়ে কি আওয়াজ তুলবো না? আর এর সুযোগ নিয়ে সমাজের অন্য পিঠে মাথা উঁচু করে হেঁটে যাবে সেই কদর্য লোকটা যে আবার কোন নারীকে অত্যাচারিত করে চুপ করিয়ে দিতে সমর্থ হবে ঠিক আজকের মতোই? আর আমার সন্তানকে তার ভবিষ্যৎ আঙুল তুলে বলবে, ওই যে ধর্ষিতা শিক্ষিকার ছেলে, টাকা ও ক্ষমতা ছিলোনা বলে ন্যায় পায়নি? আজকে হয়ত আমার পাশে দাঁড়াবেন না, কিন্তু দেখবেন আমার প্রশ্নটা কোনদিন আপনার প্রশ্ন না হয়ে ওঠে! আমি দোয়া করবো এমনটা যেন আপনাদের বা আপনাদের আপন কারো সাথে না হয়। ধন্যবাদ।