ইন দিনো দিল মেরা’

220

এই অস্থির, অসংলগ্ন, অসময়েও বঙ্গ প্রকৃতিতে এক নতুন সাজ। ফাগুনের এই সময়ে রঙে, রূপে, রসে, বর্ণে যেন এক অন্য ছটা। শুধু হতাশায় ডুব মেরে থাকায় নয়, অন্ধকারের বৃন্ত থেকে খসাতে হবে বিকৃতের বিষফল। কারণ এই বসন্তেই গাঁথা হয় জয়ের মালা। ‘বসন্ত এসে গেছে’। শুরু হল এনিয়ে আমাদের ধারাবাহিক প্রতিবেদন। এই পর্বের তৃতীয় দিনে কলম ধরেছেন নাট্যব্যক্তিত্ব কল্যাণময় দাস

কল্যাণময় দাস

একদম ছোটবেলায় আছিল ‘ফাল্গুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল, ডালে ডালে পুঞ্জিত আম্রমুকুল। চঞ্চল মৌমাছি গুঞ্জরি গায়, বেণুবনে মর্মরে দক্ষিণবায়’। বসন্তটা বোঝা যায় সতের-আঠারোতে। শরীর ছাড়া ইহা বোঝা যায় না। শরীর তখন সাড়া দেওয়া শুরু করে। তার আগে শুধু রবি ঠাকুরের ছড়া। ও ভি আচ্ছা। ছড়াগুলো একটা ভিত তৈরি করে দেয়। তারপর কাঞ্চনের মুকুলান হয়, মৌমাছি চঞ্চল হইয়া ওঠে। আর তারপরেই বসন্ত যা যা করে তার ঠ্যালা সামলাইতে বাকি জীবনের কানাগলিতে শুধুই ‘বেণুবন’ ছাড়া আর কিস্যু থাকে না। তবুও বসন্ত এক ডাল হইতে আর এক ডালে লাফালাফি করিতে করিতে ধূলার ঝড়ের সাথে কালবৈশাখীকে ডাকে। আর তারপর, নগর-জীবনের দুর্বিসহ ড্রেন-দুর্দশা কে না দেখিয়াছে।

তবুও বসন্ত। নয় নয় করিয়া পৃথিবী এইসব আম্মাদিগকে দিয়াছে আর আম্ম-তুম্ম কবিতা লিখিতে শুরু করিয়াছি, গান গাহিতে শুরু করিয়াছি, ফলে আস্তে আস্তে আস্ত একেকটা প্রেমোপাখ্যান পেখম উত্থাপন করিয়াছে। ‘মোর বীণা’ উঠেছে বাজিয়া জিম রীভসের ‘হ্যাভ আই টোল্ড ইউ লেটলি দ্যাট আই লাভ ইউ’ হইতে সুমনের ‘প্রথমত আমি তোমাকে চাই’ ছুঁইয়া নচিকেতার ‘লাল ফিতে সাদা মোজা’।

সব্বার জীবনেই ইহার আমদানি হয় কিন্তু সকলের জীবনে ইহা রপ্তানি হইতে পারে না। বসন্তের আমদানি আর রপ্তানির কথা শুনিয়া কেহ ভুরু কুঁচকাইবেন না, প্লিজ। ইহা সত্য বচন। কেননা আমদানিটা সম্পূর্ণ নিজের কল্পনার উপর নির্ভর করে, আর রপ্তানিটা দুইজনের চাহিদার উপর। বসন্তটাও ঠিক তা-ই। তাই বলিলাম যে,

একবগগা বসন্ত সবার জীবনেই বিচরণ করে কিন্তু উভায়ুভ বসন্তের অধিকারী কেহ কেহ হোইতে পারে আর তাহা অপরের ঈর্ষাকাতর আলোচনায় আরো বসন্তগ্রস্ত হইয়া হিন্দি সিনেমায় রূপান্তরিত হয়। ‘হায় রে পোড়া বাঁশি’।

‘বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’ বলিয়া কন্ঠ সুরেলা হইয়া উথলিত হইলেও এই পোড়া বাংলার গ্রামে-গঞ্জে, কল-কারখানায়, মাঠে-বন্দরে প্রচুর মানুষের জীবনে বাসন্তিকার মৃদঙ্গ বাজিয়া উঠিলেও ‘পুঞ্জিত আম্রমুকুল’ বৈশাখের ত্যাড়াব্যাড়া বাতাসে ফর্দাফাই হইয়া ঝরিয়া পড়ে অকালেই। শহুরে সেলফিয়ালিরা চড়া রঙে বসন্তকে মাখিয়া রাখে ঠিকই, বসন্তের ডিজিটাল গান শুনিতে শুনিতে ‘পোজ’ দেয়, তাহা ভালোও লাগে দেখিতে, নাচিয়া-গাহিয়া অন্যদিগকে অ-বাক করিয়া তোলে এবং শহরের পথে-প্রান্তরে কালো রাস্তার বুকে লাল-নীল-সবুজ-হলুদ-গেরুয়া-সোনালী-রূপালী আবীরের তীব্র রাত্তিরে সমস্ত বিরিয়ানির দোকানে ভিড় উপছাইয়া পড়ে এবং পরদিবসে আবার ‘ফেসবুক’কে বুক পাতিয়া সেইসকল অদ্ভুতুড়ে ফেসগুলারে ‘শো’ করাইতে হয়। উহা ফেসবুক বোঝে যে, ‘বসন্ত এসে গেছেএ এ এ এ এ এ এ এ এ …’।

বিলাপের বসন্ত সবার কলম আর মোবাইলিকার সম্পন্ন অক্ষরগুচ্ছ হইতে দমকা হাওয়ায় ঝুরঝুর করিয়া ভূমিষ্ঠ হইতে থাকে চারিপ্রান্তে । পাঠিকারা নিজেদের অধরা যৌবনে সেই ‘বস’কে অন্ত পর্যন্ত খুঁজিতে থাকেন। হুহু বসন্তের হাহা হাহাকার।  দিল্লি হইতে জলদাপাড়া ছুঁইয়া মেঘালয় পর্যন্ত জ্বলিতে থাকিলেও ‘ফাগুনের আগুন’ মানুষকে জাদুটোনা করিবেই করিবে। রাজনীতি টু প্রেমপ্রণয়ে তৈরি হইবে হোয়টস্যাপিয় গোপনতায় ‘গোপন কথাটি’। উহা ফের খসা পাতার মতো নুপূর-নিক্কন শালবনের মর্মরে মর্মরে কিয়দকাল ‘পোজ’ মারিয়া চিত্র তুলাইবে। ওঁ গোবিন্দায় নমঃ বলিয়া নিজেরে মাসান্তে কড়কড়ে নোটের বিছানায় বাসন্তিকা করিয়া তুলিবে। অনেক আগের পৃথিবীতে ভ্যারেন্ডার জঙ্গলে বুদবুদ

তুলিত কতিপয় হস্তযুগল, বেউলে-বাতাসে সেই বুদবিম্ব ভাসিয়া বেড়াইতো কিছুক্ষণ, তাহার পর মিলিয়া যাইতো কোথাও। সেইমতো বসন্তও ‘নীল দিগন্তে’র দিকে যুগে যুগে মানুষকে নিশির ডাকের মতো টানিয়া নিয়া যাইবে এবং গানের-নাচের, কাব্যের-নাট্যের উদাসী জাদুতে উড়াইয়া নিয়া গিয়া ধুপ্ করিয়া ফেলিয়া দিবে একদম কালবোশেখের কৃষ্ণকোহরার গহ্বরে।

তবু মানুষ বসন্তের ঘোড়ার পিঠে সওয়ারি হইয়াছে, হবে, হইবেও, মনে মনে ‘ধুম মচা দে ধুম মচা দে ধুম’।  চিৎকারিয়া কিম্বা গুনগুনাইয়া গাহিবে, ‘ইন দিনো দিল মেরা মুঝসে হ্যায় কহ রাহা/ তু খাব সজা/ তু জি লে জরা/ হ্যায় তুঝে ভি ইজাজত/ কর লে তু ভি মহব্বত’।  

একটা আস্ত মানুষ প্রখর রৌদ্রে কিম্বা শিরশিরে হাওয়া-চলা গভীরতর তমসায়, প্রথম বসন্তে অকারণে একাএকা কান্নার স্বাদ পাবে। সেই অকারণ কান্না বিস্মৃত করিবার জন্য স্মৃতিতে বহিয়া লইয়া চলিবে আজীবন। ইহাই বসন্ত, জীবনের প্রথম চোখের জলের উৎসব।