লেখকঃ অমল কাঞ্জিলাল

“বঙ্গ সাহিত্য আমার কৃতিত্ব দেশের লোক যদি স্বীকার করে থাকেন, তবে আমি যেন স্বীকার করি, একদা তার দ্বার উদ্‌ঘাটন করেছেন  ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।।.. দীন দুঃখীকে তিনি অর্থদানের দ্বারা দয়া করেছেন, সে কথা তাঁর দেশের সকল লোক স্বীকার করে; কিন্তু অনাথা নারীদের প্রতি যে করুণায় তিনি সমাজের রুদ্ধ হৃদয়দ্বারে প্রবল শক্তিতে আঘাত করেছিলেন, তার শ্রেষ্ঠতা আরো অনেক বেশি, কেননা তার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর ত্যাগশক্তি নয়, তাঁর বীরত্ব”।

[বিদ্যাসাগর স্মৃতি]/ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ ২৮ শে নভেঃ ১৯৩৯

এমন হৃদয়বান মানুষ উনিশ শতকে আমাদের ঘরে আর কেউ জন্মেছেন কিনা তা আমার সন্দেহ, হয়তো এর একমাত্র ব্যাতিক্রম ‘ স্বামী বিবেকানন্দ’। কুসুমের কোমলতা ও বজ্রের কঠোরতা দিয়ে গড়া তাঁর চরিত্র। নির্ভীক, তেজস্বী, অসাধারণ ধীসম্পন্ন, উদারচেতা, হৃদয়বান এই মানুষটি তাঁর শিক্ষা ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে বিগত শতকে আমাদের সমাজে যে সব গঠনমূলক কাজের ধারা তৈরি করেছেন এবং জীবনের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে তাকে সার্থক করে তুলেছেন,  ইতিহাসে তার তুলনা হয় না।

ঈশ্বরচন্দ্রের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি  শিক্ষা-বিস্তারের জন্য তাঁর নিরবিচ্ছিন্ন সাধনা। শিক্ষাকে তিনি বৃতি হিসাবে নেননি, নিয়েছিলেন ব্রত হিসাবে। আমাদের দেশে যে নানা জাতি, নানা ধর্ম, নানা ভাষা, নানা সাংস্কৃতির দেশ, সে বিষয়ে ঈশ্বরচন্দ্র ১৮৫৫ সালে ‘ বর্ণপরিচয়, প্রথম ভাগ’ শেখার সময় তখন এবং এখনকার অনেক তথাকথিত পণ্ডিতদের থেকে ঢের বেশি সচেতন ছিলেন। তাঁর  রচিত ‘বর্ণ পরিচয়, প্রথম ভাগ’ বইটি  মাতৃভাষায় (বাংলা ভাষার) রচিত ভারতের প্রথম বিজ্ঞান ভিত্তিক ধর্ম নিরপেক্ষ পাঠ্যপুস্তক। এতে এমন  কোনও শব্দ নেই যা বোঝা যায় না, ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। ধর্ম নিরপেক্ষ শিক্ষাধারা ছাড়া দেশটাকে যে এক রাখা যাবে না- সেকথা তিনি আজ থেকে ১৬৫ বছর আগেই বুঝেছিলেন। তিনি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন যে, কুসাংস্কারাচ্ছণ্ণ, অজ্ঞানের অন্ধকারে নিমজ্জিত দুর্দশাগ্রস্থ একটি জাতিকে শক্তি ও  মনুষ্যত্বের উপর দাঁড় কড়াতে গেলে ‘শিক্ষা’ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।

বাংলা সাহিত্য ঈশ্বরচন্দ্রের প্রতিভার কাছে ঋণী। ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি, শকুন্তলা, সীতার বনবাস, ভ্রান্তিবিলাস’ সহ প্রভৃতি গ্রন্থ কেবল প্রবাহমান স্বতঃস্ফূর্ত গদ্যের ঊজ্জল-দৃষ্টান্ত হিসেবেই নয়, শিল্প – সৌন্দর্য- মণ্ডিত প্রাণোচ্ছল গদ্যরূপেও আমাদের হৃদয় হরণ করেছেন। তাঁর ‘বর্ণ পরিচয়ে’র ‘জল পড়ে , পাতা নড়ে’ [‘জল পড়িতেছে, পাতা নড়িতেছে’?] –রবীন্দ্রনাথের কাছে ‘আদি কবির প্রথম কবিতা’। তাঁর সহজ ব্যকারণ রচনা, বাক্যবিন্যাস রীতি, অনুবাদ ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলা ভাষার উন্নতি সাধন করে শুধু নব নব সাহিত্য সৃষ্টির পথ উন্মুক্ত করেছিলেন তাই নয়, তিনি সামাজিক অগ্রগতির জন্য বাংলা ভাষার ব্যবহার ও প্রয়োগকে ব্যাপক ও বিস্তৃত করেছিলেন।

ঈশ্বরচন্দ্রের মতো এমন সুদৃঢ় পুরুষকার চরিত্র, এমন সংগ্রামী বলিষ্ঠ চেতনা আমাদের দেশের কোমল মাটিতে কীভাবে সম্ভব হলো, তা সত্যিই বিস্ময়ের বিষয়। অথচ, ‘বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবন চরিতের প্রতি পাতাতেই দেখা যায় যে, বিদ্যাসাগর কাঁদিতেছেন’। তাঁর মধ্যে কঠোরতা ও কোমলতার অপূর্ব সংমিশ্রণ হয়েছিল। ‘তিনি শুধু দ্বিজ ছিলেন না, দ্বিগুণ জীবিত ছিলেন’। সেইজন্যে সৈন্যহীন বিদ্রোহীর মতো তাঁকে তাঁর  বিদ্রোহের জয়ধ্বজা জীবন রণভূমির প্রান্তসীমা পর্যন্ত একাকী বহন করতে হয়েছিল। দয়া নয়, বিদ্যা নয়, তাঁর চরিত্রের প্রধান গৌরব হলো  তাঁর অজেয় পৌরুষ- অক্ষয় মনুষ্যত্ব।