দোলই যেন আমাদের প্রথম ভ্যালেন্টাইনন্স ডে

270

এই অস্থির, অসংলগ্ন, অসময়েও বঙ্গ প্রকৃতিতে এক নতুন সাজ। ফাগুনের এই সময়ে রঙে, রূপে, রসে, বর্ণে যেন এক অন্য ছটা। শুধু হতাশায় ডুব মেরে থাকায় নয়, অন্ধকারের বৃন্ত থেকে খসাতে হবে বিকৃতের বিষফল। কারণ এই বসন্তেই গাঁথা হয় জয়ের মালা। ‘বসন্ত এসে গেছে’। শুরু হল এনিয়ে আমাদের ধারাবাহিক প্রতিবেদন। এই পর্বের শেষ দিনে কলম ধরেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক পিনাকী মুখার্জি।

পিনাকী মুখার্জি

বেশ একটা দোল দুলুনী , রাঙা মাথায় চিরুনি। বসন্ত নাকি এসে গেছে! হিংসার আগুনে যখন জ্বলছে দেশের রাজধানী। বঙ্গ রাজনীতিতে ক্যা ক্যা, ছ্যা ছ্যা তখন বাংলার প্রাকৃতিক পরিবেশের ফুলে ফলে পল্লবিতে হবার সময় । জীবনের সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষে ঠুলি পরা চোখে শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্তের তফাৎ বুঝি না।পাল্টে গেছে সময়। তবুও এই মতলবি ভাঙা ভাঙা সময়ে যা কিছু দেখি তা স্বর্ণালী অতীত নয়। এক অন্ধকার ভবিষ্যতের। দোল উৎসবে ধর্মীয় রীতির থেকেও প্রাধান্য পায় উৎসব। আর উৎসব মানেই সব ভেদ বিন্দুকে দূর করে। বাংলায় বসন্ত উৎসব রবীন্দ্র ভাবনা থেকেই বিস্তার লাভ করেছিল। কবিগুরু তার প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনে এই দোল উৎসবের আয়োজন করেছিলেন।

মূলত রবীন্দ্র ভাবনাতেই রঙের এই উৎসব সামাজিক অনুষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার অতি আধুনিকতার সংকটে আজ আমরা দিশেহারা। ভেতরের ওই পশুটাকে খেপিয়ে তুলতে ওদের কতই না ষড়যন্ত্র । দুর্বল ভোগী মনটাকে রসাল খাদ্যের জোগান দিয়ে ওরা ‘মানুষটাকে’ পুরোপুরি মেরে ফেলে দিতে চাইছে। সুস্থ সংস্কৃতির আঙিনায় পশু শক্তির এই তাণ্ডব বিচলিত করছে আমাদের মন। রবীন্দ্র গানকেও বিকৃত করে যে ঘটনা ঘটানো হল এবং তাতে সামিল পড়ুয়াদেরই একাংশ তাতে শুধু লজ্জা নয়, আগামী প্রজন্মকে নিয়ে ভয়ের সঞ্চার হচ্ছে মনে। এ কোন প্রগতি? অগ্রগতির পথ বেয়ে সভ্যতা গড়ে তুলেছে নগরের পর নগর। আর এই নাগরিক সভ্যতা যদি এমন জায়গায় এসে ঠেকে তবে ‘এমন প্রগতি চাইনা’। যে দৌড়ের শেষে শুধু হাফ ধরে,পুরষ্কার পাওয়া যায় না। সে দৌড় না দৌড়ানোই বোধহয় ভালো। তাই বলতে ইচ্ছে হয় ‘দাও ফিরে সে অরন্য’।

  প্রায় এক দশক থেকে শুরু হয়েছে ফেব্রুয়ারী ৭ দিন উদযাপন। নানা দিন পেরিয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারী না কি ভ্যা-ডে। প্রেম দিবস। কিন্তু দিবস-টিবস যাই ঘোষণা হোক সরস্বতী পুজাই নাকি বাঙালীর প্রথম ভ্যা-ডে। সত্যিই কি তাই? ঐদিন প্রথম প্রথম কাপড় পরা হয় শিশু পড়ুয়াদের। প্রথম শাড়িতে বেশ একটা অন্যরকম চেহারা রূপ হয় তাঁদের। শুধু শিশুই নয়, কিশোর বেলাতেও শাড়ি পরে পড়ুয়ার দল অন্যমাত্রা দেয়। বাধন ছাড়া উল্লাসে মাতলেও পূজাকে ঘিরে থাকে উৎসবের ঘনঘটা।

তাই কেন যেন বার বার মনে হয় দোল। রাঙিয়ে দেবার এইদিন টাই বাঙালীর প্রথম ভ্যালেন্টাইনন্স ডে। এক প্রথম ছোঁয়ার শিহরন। ধুসর আকাশেও নিজেকে কিছুটা রঙে ঢং-এ খুঁজে পাবার চেষ্টা। এখন তো আবার ড্রেসকোড পরে রীতিমত রাঙিয়ে দেবার আনন্দে মাতোয়ারা থাকে কিশোরী থেকে যুবতী। ফুলদের হৃদয়েতে কতটা ফুল থাকে এ নিয়ে সংশয় থাকলেও , সেদিনই প্রথম আলতো ছোঁয়া , স্পর্শে এক নতুন অনুভূতির দিগন্ত উন্মাোচন। পত্রে,পুস্পে,আলোয়, হাওয়ায় জীবন্ত হৃদয় মাঝে এক নতুন দিশা। অতলান্ত গভীরতায় অগ্নিষ্ট হয় যেন হোমানল।