আরণ্যক দিব্যেন্দু

পূজার ছুটিতে কোথায় বেড়াতে যাবেন ভাবছেন? একেবারে হাতের কাছে উত্তরবঙ্গের জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান একবার বেড়িয়ে যেতে পারেন, মন্দ হবে না।

 মুলত এক শৃঙ্গ গণ্ডারের আবাস্থল হিসেবেই পরিচিতি এর দেশে বিদেশে  এই জাতীয় উদ্যান । তবে গণ্ডারের পাশাপাশি পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাণীটিও কিন্তু কম নেই এখানে । সর্বশেষ সুমারি অনুযায়ী জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান এলাকায় রয়েছে ১৩০ টি হাতি । এর পাশাপাশি অসমের মানস অভয়ারণ্য ও ঝাড়গ্রাম থেকেও মাইগ্রেট করে হাতির দল ফি বছরই আসে এখানে । এশিয়ার বৃহত্তম পিলখানাটির অবস্থান এখানেই । নাম ” হলং পিলখানা ” । একই সঙ্গে পিলখানাটি হাতিপুনর্বাসন কেন্দ্রও বটে। চা -বাগানে পরে থাকা , বা দল ছুট অথবা অসুস্থ হাতি শাবকদের এখানে রেখে বড় করে তোলা হয় । ধীরে ধীরে তারা যোগ দেয় বনবিভাগের কাজে । হয়ে ওঠে ” কুনকি ” । বর্তমানে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে বনবিভগের “ডিউটি’র জন্য রয়েছে ৮০ টি হাতি ।

এখানে এত বিপুল সংখ্যায় বন্য ও কুনকি হাতি যখন রয়েছে, তখন হাতির পিঠে চরে বনবাদাড়ে বেড়িয়ে আসার সুযোগও আপনি পেতে পারেন। বেড়িয়ে আসতে পারেন হলং পিলখানা , জলদাপাড়া ইস্ট , ওয়েস্ট , নর্থ , সাউথ , কোদালবস্তি। যেখানে বিভিন্ন বিভাগে জলদাপাড়ার হাতিরা রয়েছে। এছাড়াও অসংখ্য খালবিল , ঝোরা , জঙ্গল পেড়িয়ে মিশে যেতে জলদাপাড়ার গহিন জঙ্গলে । দু ঘণ্টার জঙ্গল সাফারিতে দেখা হয়ে যেতে পারে নানা বন্য জন্তু ও পাখিদের । আর কোন ভ্রমণ পিপাসু জঙ্গল প্রিয় মানুষ এই সুযোগ হাত ছাড়া করেন, বলুন তো!

মাহুতের সাথে জঙ্গল থেকে খাবার সংগ্রহ করে ফিরছে কুনকি হাতি

ও হ্যাঁ শুধু ঘুরে বেড়ানো নয়, হাতির খাবারদাবার, পরিচর্যা,  উদ্ধার হওয়া হাতি নিয়ে নানান কাহিনী, তাদের কাজকর্ম সম্পর্কেও অবহিত হতে পারবেন আপনি। বিশাল চেহারার হাতি। তাহলে কতটা খাবার লাগতে পারে, সেটা বুঝতেই পারছেন। তথ্য বলছে, প্রতিটি হাতি দিনে ৩০০ কেজি ঘাস ও ২০০ লিটার জল খায় । কম কথা নয়। এখানে ২ শো র বেশি হাতি রয়েছে, তাদের কতটা খাবার জোগার করতে হয় বুঝতে পারছেন। দেখা যায় সেই খাবার সংগ্রহে মাহুতকে পিঠে নিয়ে জঙ্গলের এপ্রান্ত থেকে অপ্রান্ত ঘুরে বেড়ায় হাতির দল। অনেক সময় হাতির খাবার সংগ্রহকারী কর্মী, যারা পাতাওয়ালা নামে পরিচিত, তাঁরা বেশ যত্ন করে ওদের খাবার তুলে দেয় । মাহুতদের সাথে হলং নদীতে গিয়ে স্নান সেরে নেয় হাতির দল । মাহুতরা বেশ ঘসে মেজে স্নান করান। তখন ওদের খুশি যেন চেহারায় ফুটে ওঠে।  বিকেল ৪ টায় মাহুতরা কাজ শেষ করে চলে যান। কিন্তু হাতি তো সারা রাত খায়। তাই পিলখানায় ওদের জন্য রয়েছে ‘সাপ্লিমেন্টারী ফুডের’ ব্যবস্থা । বনবিভাগের ভাষায় যাকে বলা হয় ” দানা ” । পাতাওয়ালারা কলাপাতার মোড়কে এই দানা সব হাতির জন্য তৈরি করেন । এতে থাকে ডাল, চাল, ঘাস , লবণ ও গুড় । প্রত্যেক হাতির জন্য বয়স ও ওজন ভেদে এই দানা বা রেশন বরাদ্দ রয়েছে।

কুনকি হাতিদের নাম করণ করা হয়। জলদাপাড়ায় ভীম, তিস্তা, টারজান সহ বিভিন্ন নামের হাতি রয়েছে। ভীমের গল্প জানেন! সেই ঝাড়খণ্ডে দলছূট হয়ে গিয়েছিল। ভুলে নদীতে নেমে যাওয়ায় ভেসে যাচ্ছিল। তখন সেখানকার বনকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে হলঙয়ের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে আসে। দিনটা ছিল ২ ফেবরুয়ারি , ২০১৮ । সেই থেকে ২ বছরের হস্তি শাবক ভীম এখানে দিব্যি আছে ওর মাহুত অমল ওড়াও এর অধীনে । ভীম প্রথমে চূপচাপ থাকলেও এখন বেশ আছে । ফুটবলও খেলে মাহুত ও পাতাওয়ালাদের সাথে। জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের প্রাক্তন সহকারী বন্যপ্রাণ সংরক্ষক বিমল দেবনাথ কাছে জেনেছিলাম ভীমের সেই উদ্ধার হওয়ার কাহিনী।

 তিস্তা নদী দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল আরও এক হস্তি শাবক। তাকে উদ্ধার করে এখানে আনা হয় । ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাস । নাম রাখা হয় তিস্তা । তাকে বড় করে তোলে মাহুত জাহাঙ্গীর হক । ১৯৯৬ সালে ভেলাকোবা এলাকায় পাওয়া যায় দাপুটে এক হস্তিশাবককে । আনা হয় হলঙ পিলখানায় । নাম দেওয়া হয় টারজান ! প্রথম দিকে সমস্যা সমস্যা হলেও মাহুত মঙ্গল ওঁরাও ধীরে ধীরে টারজানকে বাগে নিয়ে আসে। এখন তিস্তা ও টারজান বেশ রয়েছে। ধীরে ধীরে ওরা কাজে যেতে শুরু করেছে । শিখছে জঙ্গলের পাঠ । তিস্তা আর টারজানের গল্প জানিয়েছিলেন রেঞ্জ অফিসার স্বপন কুমার মাঝি ।

ছোট্ট শাবককে নিয়ে মা হাতির পিঠে মাহুত

বছর খানেক আগে সুদূর কর্ণাটক থেকে নিয়ে আসা হয়েছে ধরমাইয়া , মাদাকোজী , ময়ূরা , শ্রীনরীবাম , বীটোলীরা নামের হাতিদের। প্রথম দিকে ভাষাই বুঝে উঠতে পারছিল না। এখন ধীরে ধীরে বাংলার ” সহজপাঠ ” শিখছে ওরা।  এখানে থাকতে হলে এখানকার ভাষা তো জানতেই হবে ! তাই ওরা শিখছে – ” রহ ” অর্থাৎ থামো , ” মাইল ” অর্থাৎ চলো । ইত্যাদি , ইত্যাদি । জলদাপাড়ার কুনকি হাতি ঐরাবত , ভরত , অণূসুয়াদের সঙ্গে এরা ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে উত্তর বাংলার জলজঙ্গলে । বন দফতরের আধিকারিকরা সর্বক্ষণ নজর রেখে চলেছেন ভিন রাজ্যের হাতিদের প্রতি । অসম থেকে ঘুরে গেছেন আন্তর্জাতিক হাতি বিশেষজ্ঞ পার্বতী বড়ুয়া । এখানকার হাতির তুলনায় আকার প্রকারে অনেকটাই বড় কর্ণাটকের হস্তিকুল। এদের ঘিরে বনকর্মী পর্যটকদের উৎসাহও প্রবল। আর বাঙালির উৎসুক মনও বুজতে শিখে গেছে ময়ূরিরা । মানুষ দেখলেই মাথা দুলিয়ে , শুঁড় নেড়ে মজাও করে নিচ্ছে । হাতির প্রসঙ্গ কথা বলতে গিয়ে জলদাপাড়া ডিভিশনের ডিএফও কুমার ভিমল ও রেঞ্জ অফিসার সুরঞ্জন সরকার জানিয়েছিলেন, “হাতি মাঝে মধ্যেই হাতি তার নিজের শক্তি যথেষ্ট রয়েছে কিনা, তা যাচাই করে নেয়। অনেক পুরানো স্মৃতি মনে করতে পারে। কেউ কক্ষনও দুর্ব্যবহার করলে সুযোগ বুঝে প্রতিশোধ নিয়ে নেয়। তাই হাতি দেখার সুযোগ মিলবে, চড়তে পারবেন পিঠেও। কিন্তু ভুল করেও কক্ষনও হাতির সাথে দুর্ব্যবহার করবেন না।

যাইহোক হাতি নিয়ে আরও অনেক গল্প আছে। সেসব না হয় জলাদাপাড়ায় এসেই শুনে যাবেন। জলদাপাড়ায় যেতে শিলিগুড়ি বা কোচবিহার থেকে প্রাত্যহিক চলাচলকারী সরকারি বেসরকারি বাস অথবা ভাড়া করা ছোট গাড়িতে যেতে পারবেন। সেখানে থাকার বহু সরকারি ও বেসরকারি কটেজ রয়েছে। সেগুলো বেশিরভাগই অনলাইনে আগাম বুক করার ব্যবস্থা রয়েছে। এবার পূজায় বেড়াতে আসতে চাইলে দ্রুত বুকিং করার চেষ্টা শুরু করুন। ও হ্যাঁ জলদাপাড়ার পাশাপাশি ডুয়ার্সের পাহাড় জঙ্গল, দার্জিলিংয়ের পাহাড় অথবা ভুটান ঘুরে আসারও সুযোগ রয়েছে।