কাটোয়ার ফরজ শেখের উদ্যোগে রক্ষা পেল কালীমূর্তি , আবারও সংহতির অনন্য নজির এই বাংলায়

280

ওয়েব ডেস্ক, ২৭ অক্টোবরঃ ধর্ম কখনও বিভেদ সৃষ্টি করে না। পরিকাঠামো গত মন্দির মসজিদে বিভেদ থাকলেও আসলে ঈশ্বর এক ও অভিন্ন।‘ কেউ আল্লা বলে কেউ বলে ভগবান, মানুষ আগে মানুষ পরে হিন্দু কিংবা মুসলমান’। অস্থির অসংলগ্ন এই সময়ে বৃষ্টির হাত থেকে কালী মূর্তিকে রক্ষা করতে ইসলাম ধর্মের বিশ্বাসী ফরজ শেখের পরিবার হাত বারালো প্রতিবেশে মৃৎ শিল্পীর দিকে। আর এর ফলেই এক অন্য নজির সৃষ্টি হল এই বাংলায়। কাটোয়ার খাজুরডিহি গ্রামের এই ঘটনা, দীপান্বিতার এই উৎসবে বড় উদাহারন হয়ে রইবে বহুদিন।

হিন্দু প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ালেন মুসলিম যুবক। সৌজন্যে দিন চারেকের টানা বৃষ্টি। বৃষ্টির হাত থেকে প্রতিবেশীর গড়া কালী প্রতিমাগুলিকে বাঁচাতে নিজের ঘরে রাখার জায়গা করে দিলেন ফরজ শেখ। তাতেই কাটোয়ার গ্রামে ফুটল সম্প্রীতির ফুল।

ক’দিন ধরেই কখনও জোরে, কখনও ধীরে চলছিল নিম্নচাপের বৃষ্টি। তাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন অসীম পাল। কাটোয়ার খাজুরডিহি গ্রামের মৃৎশিল্পী অসীম বুঝে উঠতে পারছিলেন না এতগুলো প্রতিমাকে বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করবেন কীভাবে! যে পলিথিন উঠোনে টাঙিয়েছিলেন, তাতে সব প্রতিমাকে বাঁচানো যাচ্ছিল না। ধুয়ে যাচ্ছিল মাটি। গলে পড়ছিল রং। এদিকে সময় নেই। রাত পোহালেই কালীপুজো। সব শেষ করে এতগুলো কালী প্রতিমা দেবেন কীভাবে, এই দুশ্চিন্তায় যখন মাথার চুল ছিঁড়ছিলেন, তখন বিষয়টি খেয়াল করেন প্রতিবেশী আফরোজা বিবি। অসীমের এই নাজেহাল দশা দেখে স্বামী ফরজ শেখকে বলেন, যা হোক কিছু একটা সুরাহা করতে।

স্ত্রীর অনুরোধে সাড়া দিয়ে নিজের বাড়ির একটা ঘর ছেড়ে দেন ফরজ। বৃষ্টির জল যাতে প্রতিমার গায়ে না লাগে সেইজন্য অসীমের সঙ্গে হাত লাগিয়ে তাঁর বাড়ির উঠোন থেকে প্রতিমাগুলিকে এনে নিজের ঘরে রাখেন। অসীমের মাথায় ছাতা ধরেন। প্রতিবেশীর এহেন মহানুভবতায় অভিভূত অসীম বলেন, ‘নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিমা দিতে না পারলে পুজো উদ্যোক্তারা তো আমাকে ছিঁড়ে খেত। কোনও অজুহাত শুনত না। ফরজ ভাই না থাকলে মা কালীও আমাকে বাঁচাতে পারত না।’

এমন কৃতজ্ঞতার উত্তরে ফরজের প্রতিক্রিয়া, ‘প্রতিবেশী বিপদে পড়েছে। যদি সাহায্য না করি গুনাহ হত। মানুষ অন্য মানুষের বিপদে পড়লে সাহায্য করতে হয়, এটাকেই ধর্ম পালন বলে মনে করেছি।’ এমন দৃষ্টান্ত তৈরিতে গর্ব ঝরে গ্রামের বাসিন্দা তাপস ব্যানার্জি, বদাই শেখদের গলায়, ‘আমাদের এই খাজুরডিহি গ্রামে হিন্দু–মুসলিম দুই সম্প্রদায়ই দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বাস করি। দুর্গাপুজোই বলুন আর ইদই বলুন, দুই উৎসবই গ্রামের উৎসব হিসেবেই পরিচিত। কোনও বিশেষ সম্প্রদায়ের নয়। আমাদের দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনও গন্ডগোল নেই।’

যে ঘরটি কালী প্রতিমা রাখার জন্য ফরজ সাহেব অসীমকে ছেড়ে দিয়েছেন, মসজিদে যেতে না পারলে সেই ঘরেই নমাজ পড়েন। এদিনও কালীপ্রতিমাগুলির পাশে মেঝেয় একচিলতে জায়গা করে নিয়ে নমাজ পড়লেন ফরজ। আর পাশে প্রতিমাগুলিকে রং করলেন অসীম। ফরজ আল্লাহতালার কাছে আর্জি জানালেন, এই ভাই ভাই ঠাঁই অবস্থাটা শুধু খাজুরডিহি গ্রামেই নয়, গোটা রাজ্যজুড়ে যেন অটুট থাকে।