লেখকঃ শৌভিক রায়

Maw শব্দের অর্থ যে পাথর তা জানা ছিল আগেই। জানা ছিল সাম্প্রতিক কয়েক দশকের বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় (বছরের হিসেবে) এখানেই। এটাও জানতাম  কলম্বিয়ার লোরো এবং লোপেজ ডি মাইকে ঘাড়ের কাছে শ্বাস ফেললেও গ্রীনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নিজের নাম তুলে নিয়েছে পূর্ব খাসি হিলসের এই ছোট্ট গ্রামটি।

……কিন্তু জানতাম না শিলংয়ের ৬৫ কিমি দূরে (চেরাপুঞ্জি থেকে  ১৬ কিমি পশ্চিমে, যদিও পাহাড়ের জন্য ঘুরপথে অনেকটা যেতে হয় বলে যাওয়া ভালো শিলং থেকেই) মৌসিনরামে লুকিয়ে আছে এতো কিছু।

মৌসিনরাম পাহাড়ের গায়ে গায়ে মেঘেদের চলাচল। ছবিঃ শৌভিক রায়

না …ভূগোল বা ইতিহাস দিয়ে আমি বিচার করছি না মৌসিনরামকে। করছি না বিচার অন্য কোনো আঙ্গিকেও। আমাদের মাত্র কয়েকদিনের এই বেড়ানোর উদ্দেশ্য মৌসিনরাম ছিলও না।  উদ্দেশ্য আগের দিনই সফল হয়েছে দারুণভাবে। কিন্তু ভাবিনি মৌসিনরামেরও এতো কিছু দেওয়ার আছে। 

 পথের অপরূপ শোভা বাদেও খাসি জনজাতির সাথে মেশা, তাদের গ্রাম, গ্রামের দোকান ইত্যাদি শেষ হবার পরে বাঁক ঘুরতেই যেন রহস্যময় হয়ে উঠলো চারদিক।  সে এক অনন্য পাওয়া। সাথে হু হু হাওয়া আর  ছমছমে পরিবেশে বৃষ্টির গন্ধ। দূরে পাহাড়ের গায়ে এলিয়ে থাকা মৌসিনরাম ঢেকে গেলো মুহূর্তেই। উড়ে এলো মেঘ সওগাত জানাতে।                                   

মৌজীর্নবুয়ন গুহার স্ট্যালাগমাইটের গরুর বাঁটের মতো ঝুলতে থাকা আর ঠিক নিচে থাকা শিব লিঙ্গরূপী পাথরে টপ টপ করে জল ঝরানো এক তাজ্জব কান্ড।  গুহার আদিম প্রকৃতি, গারো পাহাড়ের সাজু গুহার সাথে এর যোগাযোগ ইত্যাদি নিয়ে কেন কিভাবে কবে……নাঃ আমার মাথা ঘামানোর দরকার নেই। শুধু জানি এই গুহার অভ্যন্তরে সাড়ে চার কিমি যাওয়া যায় আলো নিয়ে। ভীতু মানুষ আমি, আছে ফেরার তাড়াও। তাই খানিকটা ঢুকেই আমার গুহাদর্শন সম্পূর্ণ। বোঝা গেল অবশ্য তাতেও গুহার আদিম রূপ। আর বাকি কিছুতে যাই না,  আছেন গুণীজন, পন্ডিত ব্যক্তিরা, বিজ্ঞানীরা। জানাবেন তাঁরা  আমি তো কেবল দেখবো। দর্শনেই আমার আনন্দ।  দেখলামও।  বর্ণনা কি দেব আর! যে দেখেছে সে জেনেছে আর মজেছে… আর না দেখলে, সত্যি বলতে, বোঝা মুশকিল। গুহার রাস্তাটাই মনে করিয়ে দেয় “সাধু সাবধান”…        

মৌজীর্নবুয়ন গুহার স্ট্যালাগমাইটের গরুর বাঁটের মতো ঝুলতে থাকা আর ঠিক নিচে থাকা শিব লিঙ্গরূপী পাথরে টপ টপ করে জল ঝড়ে পড়ছে। ছবিঃ শৌভিক রায়

 

 গত দিনের মূল উদ্দেশ্য সফল হয়েছে ঠিকই কিন্তু সুন্দরতম ব্যাপারগুলি তো সহজেই সফল হয় না….তাই-ই বোধহয় সারা শরীরে সুঁচ ফোটার যন্ত্রনা। কিন্তু এই অদ্ভুত গুহা মুখে দাঁড়িয়ে নিমেষেই হাওয়া সেসব ! আকাশ কখনো ঘন কালো, সূর্য নেই কোত্থাও আবার হঠাৎ হঠাৎ সে নাগালের কাছে চলে এলেও মেঘের চাদর গায়ে জড়িয়ে নিচ্ছে একটু পরেই ৪,৬০০ ফিট উচ্চতার এই জনপদে। দূরে দূরে পাহাড়ের গায়ে দু’চারটে বাড়ি, দু`একটা চার্চ। পাইন, বার্চ, দেওদারের ডালে অদ্ভুত অজানা ডাক আর সাথে ঝিঁঝিঁপোকার রোমহর্ষক গুঞ্জন।

সারা চেরাপুঞ্জির প্রতিটি গ্রামই ঝকঝকে তকতকে। স্যালুট এদের পরিবেশ ভাবনাকে, এলাকাকে নোংরা না করবার মানসিকতাকে। মৌসিনরামও একই। জনবসতিতে খানিক পরেপরেই রাখা ডাস্টবিন, নেই কূটোটুকু পর্যন্ত পথেঘাটে। মানুষ যেমন দায়িত্ব নিয়েছে নিজেদের বসতিকে ঝকঝকে রাখার তেমনি বৃষ্টিও যেন পালন করছে তার কাজ কেবল ঝরে প্রকৃতিকে আরও সবুজ ক’রে! 

আঁকাবাঁকা পথে এবার সারা গ্রাম বেড়ানো। লোককে জিজ্ঞেস করে পথের খোঁজ নেওয়া, কেননা আমাদের গাড়ি সমতলের, নিজেদের শহরের। আজকাল গুগুল ম্যাপের কল্যানে বেশির ভাগ জায়গাতেই দরকার পড়ে নি এমন কি পথ নির্দেশিকা পড়বারও। গুগুল ম্যাপের মহিলা কণ্ঠ ডাইনে বাঁয়ে, ১০০ মিটার , ৫০০ মিটার, টার্ন লেফট, টার্ন রাইট করে ঠিক পৌঁছে দিলেও সব জায়গাতেই তিনি যে অন্তরে থেকে চালাবেন তা তো হতে পারে না ! আমার পুরুষত্বেও খানিকটা লাগছিলো যেন ব্যাপারটা! এই মহিলা আমাদের চালাচ্ছেন নেপথ্যে থেকে এভাবে ! মৌসিনরাম অন্ততঃ  আমাকে সেটা থেকে মুক্তি দিল। 

ছবিঃ শৌভিক রায়

খাসি মহিলাদের চালানো দোকান থেকে কেক, পাই (খ্রীষ্টানদের সংখ্যা বেশি এদের মধ্যে) খেয়ে “কুবলেই” (ধন্যবাদ ) বলে ফিরতি পথে আবার হারিয়ে যাই মেঘবন্দী পথে….কানে শুধু ঝরঝর শব্দ, খাসি পাহাড়ের অজস্র ঝর্ণার কোনো একটির! পেছনে পড়ে থাকে মৌসিনরাম, ঢেকে যায় মেঘে…জানি না আবার কবে মেঘ ঠেলে দেখতে যাব পাথরসুন্দরীকে…..

লেখক পরিচিতিঃ শৌভিক রায় পেশায় শিক্ষক। সাহিত্য চর্চার সাথে দীর্ঘ সময় ধরে যুক্ত।
ইতিমধ্যেই ইছামতির স্বপ্নাদেশ ও অন্যান্য, বৃত্তপথ, ডুয়ার্সের নোটবুক নামে তাঁর কাব্যগ্রন্থ , আত্মজীবনী মূলক গদ্যগ্রন্থ – মুজনাইয়ের বালক, ভ্রমণ গ্রন্থ – GOআ, শব্দ ছবির ডুয়ার্স ও ছোট গল্পগ্রন্থ – সুরমা কলিং প্রকাশিত হয়েছে।
এছাড়াও বিভিন্ন বাংলা দৈনিক পত্রপত্রিকায় নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি
তিনি মুজনাই সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করে আসছেন।