লেখিকাঃ
গৌতমী ভট্টাচার্য

 সৃষ্টি আর ধ্বংস এই দুই নিয়ে আমাদের জীবন আমাদের পথ চলা।পথ চলতে চলতে খুঁজে পাই পুরনো সামগ্রী যা আমাদের অস্তিত্বকে জাগিয়ে তোলে। আমাদের চেতনাকে নাড়া দেয়। আর তার রহস্য আবিষ্কার করতে করতে রচনা করি ইতিহাস। আমরা নতুনকে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে পুরনো অনেক কিছু হারিয়ে ফেলি। হয়ত যা ছিল একদিন আমাদের আনন্দ, অত্যন্ত ভালোলাগার সম্পদ। উন্নতমানের কিছু পাবার আশায় আমাদের নতুন প্রজন্ম প্রাচীন অস্তিত্ব থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তারা জানেই না সে সব জিনিসের মূল্যায়ন।আসলে এটাই  নিয়ম। আমরা দুঃখ পাই, হায় হায় করি। কিন্তু কিছু পেতে গেলে  আবার কিছু হারাতেও হয় – এই চিরন্তন সত্যকে মেনে নিয়েই আমাদের সামনে পা ফেলতে হয়।

 এই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসে যদি এক একটি অস্তিত্বকে তুলে ধরা হয় তাহলে পুঁথিগত বিষয়কে খুঁজে নিয়ে বলি – এখন খুদে পড়ুয়ার দল বিদ্যাসাগরের বর্ণ পরিচয় পড়ে না। মদনমোহন তর্কালঙ্কারের শিশুশিক্ষাও পড়ে না। বাবা-মায়ের ইচ্ছে অনুসারে শিশুর জীবনের গতিবেগ নির্দ্ধারিত হয়।এছাড়া নির্দ্ধারিত হয় স্কুলে পাঠ্য বইয়ের সূচী অনুসারে। তাই বর্ণপরিচয় বা শিশুশিক্ষা মানুষের মন থেকে ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে। বিভিন্ন পুস্তককোম্পানী বা পাবলিশার্স  শিশুপাঠ্য উপযোগী রঙিন মলাট , রঙিন ছবি দিয়ে, স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণকে এমনভাবে চিত্রিত করে প্রকাশ করছে যে তাতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দৃষ্টি দিচ্ছে সেইসব রঙবাহারী বইগুলোতে। শিশুর চোখে রঙিন দুনিয়া গড়ে তোলবার জন্য পাঠ্য হচ্ছে সেইসব বই।তাই ফিঁকে মলাটের বর্ণপরিচয় এবং শিশুশিক্ষা অস্তিত্ব হারাচ্ছে।

কানামাছি খেলা ছবিঃ সংগৃহীত

অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে- হারিয়ে যাচ্ছে কত না খেলা। এক্কা- দোক্কা ,দাড়িয়াবান্ধা,গোল্লাছুট,বৌ-বসন্তী, ডাংগুলি,মার্বেল এছাড়া ঘরোয়া খেলা যেমন ইকিড়মিকিড়,ফুল-ফল-দেশ, রান্নাবারি,পুতুলখেলা,এছাড়া আরো কত কী! ইঁটের বাড়ির ভীড়ে মাঠগুলো এখন নিশ্চিহ্ন প্রায়। স্বতঃস্ফূর্তভাবে খেলার আনন্দ যা শিশুর সহজ-সরল মনে আনন্দের ঢেউ তোলে, নানা বাধ্য-বাধকতার শুকনো চড়ে সে ঢেউ আর আছড়ে পড়ে না। ট্রেনিং প্রাপ্ত খেলাতেই শিশুমনে গুঁজে দেওয়া হয় চাবিকাঠি। ক্যারাটে ,ক্রিকেট, ফুটবল ব্যাডমিন্টন,টেনিস ইত্যাদি।বাঁধনছেঁড়া উল্লাস গুটিয়ে যায় ঘুড়ির সুতোর লাটাইয়ে। পুঁথিগত বিদ্যায় তোতাপাখি গজগজ করে। লোহার গেটে দাঁড়িয়ে শিশুদের চোখে হতাশার ছাপ।হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব। দুটো সুপুরি গাছের মাঝে দড়ি টাঙিয়ে বস্তা পেতে দোল দোল দুলুনি খেলার আনন্দ বা সুপুরি গাছের ডোঙা পড়লেই খপ্ করে তুলে নিয়ে গাড়ি বানিয়ে তাতে চেপে বসে চালক আর যাত্রী হয়ে যে মুক্ত উল্লাস – আজ তা কোথায় ?

আমাদের ছোট্ট শহরটা দিনে দিনে কেমন বদলে যাচ্ছে।আসলে বদলে যাচ্ছি আমরাই। আমাদের মানসিকতা। আমাদের কোচবিহার শহরের পরিবেশটা এখন আর আগের মতো সবুজ নেই। শান্ত ভেজা মাঠ নেই। আম কাঁঠালের গাছ খুঁজলে শহরে দু’একজনের বাড়িতে দেখা যায়। তবে নারকেল আর সুপুরি গাছ পুরনো কিছু বাড়িতে এখনও দেখা যায়। কোচবিহারের অলিতে- গলিতে এখন কংক্রীটের দালান। দোতলা-চারতলা-সাততলা। উঁচুউঁচু টাওয়ার নেটওয়ার্ক সার্ভিস দেওয়ার জন্য মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।কিন্তু পাখির গানে এখন আর সকাল জাগে না।

এক্কাদোক্কা ছবিঃ সংগৃহীত

এখন শহর বা গ্রামাঞ্চলে ঘুরলে কোন বাড়িতে মাটির উনুন দেখা যায় না। মাটির দেয়ালে বা খোলা মাঠে গোবর দিয়ে ঘুঁটে বানিয়ে রোদে শুকোনো তারপর উনুনে ঘুঁটে আর কয়লা সাজিয়ে তাতে আগুন জ্বালিয়ে আকাশ ঢেকে যাওয়া ধোঁয়ার মেঘ আর দেখা যায় না।কলাপাতা বা কলার খোলায় এখন আর ভাত খাওয়া হয় না।খুব ছোটবেলায় দেখেছি অনুষ্ঠান বাড়িতে খাবার পরিবেশন করা হ’ত কলাপাতায় বা খোলায়।সাথে মাটির গ্লাসের গন্ধে ঠান্ডা জলের স্বাদ। কলাপাতায় গড়িয়ে যাওয়া ঝোল টেনে নিয়ে হাপুস-হুপুস শব্দে খাওয়ার সুখ হারিয়ে গেছে।

জলচৌকি ,হাতপাখা এসব এখন অচল প্রায়।গোরুর গাড়ির ক্যাঁচর ক্যাঁচর আওয়াজ আর ওঠে না গ্রামের পথে। কমে যাচ্ছে রিক্সার সংখ্যা। হারিয়ে যাচ্ছে ন্যাকড়ার পুতুল,পোড়া মাটির পুতুল।

ছোটবেলায় পুজোর আগে কান পেতে মহালয়ার চন্ডীপাঠ শুনতাম রেডিওতে, ট্রানজিস্টারে। আগে গান শোনা খবর শোনার মাধ্যম ছিল রেডিও।এখন আর রেডিওর তোয়াক্কা কেউ করে না।কারণ টেলিভিশন আমাদের অনেক এগিয়ে দিয়েছে।আমরা এখন সরাসরি সব কিছু দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন চ্যানেলগুলিতে। পুজো এলেই আমরা অপেক্ষায় থাকতাম ভালো ভালো পুজোসংখ্যার গান শোনবার জন্য।কোন প্যান্ডেলে যদি ভালো গান বাজত তাহলে সেখানে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে মন দিয়ে সে গান শুনতাম। সে গানে ছিল আলাদা আমেজ।

ছবিঃ সংগৃহীত

স্কুলবেলায় আমাদের কোচবিহার শহরে দেখেছি পুতুল নাচ হ’ত। মনে পড়ে সে দিনগুলোর কথা। রিক্সার মধ্যে মাইকের চোঙা লাগিয়ে শহর জুড়ে ঘোষণা হ’ত পুতুলনাচ দেখবার জন্য। কোন বড় মাঠে প্যান্ডেল করে সাতদিন , দশদিন ধরে পুতুলনাচ চলত। কত পালা ,নাটক দেখান হ’ত পুতুলনাচের মাধ্যমে। হাঁ করে তাকিয়ে দেখতাম। হাতে সুতো লাগিয়ে সুন্দর সুন্দর মুখের আবার কিছু বিচ্ছিরি মুখের পুতুলকে নাচিয়ে নাচিয়ে , কথা বলে কত কাহিনী দেখান হ’ত। সে সব ভোলার নয়।হারিয়ে গেছে পুতুল নাচের ইতিকথা।

সময় থেমে থাকে না। সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু বদলে যায়। তাই হারাবার দুঃখকে মেনে নিয়ে নতুন সৃষ্টির পথে আমাদের আগুয়ান হতে হয়। নইলে এক জায়গাতেই থমকে যেতে হয়। পুরাতনকে মনে রেখে সৃষ্টির উদ্ভাবনে এগিয়ে যাওয়াই জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ।

পরিচিতিঃ গৌতমী ভট্টাচার্য। বাচিক শিল্পী, সঞ্চালক। এছাড়া সঙ্গীতের প্রতি আছে অনুরাগ। ছোটবেলা থেকেই লেখালিখির শখ। একটি ছড়া বই (ছন্দরূপ) প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হচ্ছে