লেখকঃ শৌভিক রায়

            বড়কাকার ফিলিপস ট্রানজিস্টারে “তব হে অচিন্ত্য” শুনলেই বুকটা মোচড় দিয়ে উঠতো। সাথে তো বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই উদাত্ত কন্ঠে ভাষ্য।

               ঘুমোতে খানিক রাত হ’ত কেননা আগের রাতে মাংস হয়েছে। গৃহকর্ত্রী বৈষ্ণব বলে মাংসের ব্যাপারে কড়াকড়ি ছিল। রান্নাঘরে (গৃহকর্ত্রীর ভাষায় ‘পাকঘর’) মাংস ঢুকতো না। আমাদের দিনহাটার বাড়ির আমাদের ও বড়কাকার ঘরের সামনের পাকা বারান্দায় (বাড়ির বাকি ঘরগুলো তখনও মাটির) মাংস রাঁধতেন মা আর বড়কাকীমা। কি তার সুঘ্রাণ! নাকে আজও লেগে আছে। প্রায় হত্যে দেওয়ার মতো বসে রইতাম কখন নামবে মাংস! প্রেসার কুকার সিটি দিতে শুরু করলেই বুকে ঘোড়দৌড়…নামলো ব’লে, আর একটু! জিভে চলে আসা জল সুড়ুৎ করে টেনে বড়কাকার ঘরে বড়কাকাকে মনে করিয়ে দেওয়া ট্র্যানজিস্টার যেন ঠিকঠাক রাখে। তারপর? তারপর আর কি। নলী হাড় চুষে, মেটে খেয়ে আর বারবার ঘুমের ঘোরেও হাতে মাংসের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে আধো তন্দ্রা আধো জাগরণেই কানে আসতো “রূপং দেহি…” “অ্যাই শুভু ওঠ, মহালয়া শুরু হয়ে গেছে তো!”

              তখনও আকাশ অন্ধকার। ঘুম চোখে বড়কাকা বা বাবা বা বড়কাকীমা বা মায়ের পাশে শুয়ে বাকি সময়টা কোনদিক দিয়ে যে কেটে যেত টেরটাও পেতাম না!

মহালয়া শেষ হবার আগেই দল বেঁধে রাস্তায় সব। কে যে এটা চালু করেছিল কে জানে। তবে গতরাতে যারা পিকনিক করেছে মাইক বাজিয়ে তাদের সবাই সেই দলে থাকতো না। তাদের ঘুম তখনও ভাঙেই নি। দিনহাটা হাইস্কুল, থানা, হসপিটাল, হলের মাঠ, মদনমোহন বাড়ি, আমরা সবাই ক্লাব পেরিয়ে কলেজ। আরও যাবি? হ্যাঁ হ্যাঁ চল…বুড়ির পাট অবধি। বাপরে কতদূর! অন্যসময় আসিই না কখনো হেঁটে এই এত্তোদূরে, কিন্তু আজ যে মহালয়া!

                    এরকমই একবার বুড়ির পাট থেকে ফেরার সময় গা ঘেঁষে খুব জোরে বেরিয়ে গেল মা সন্তোষী বাসটা। প্রায় চাপা দেয় আর কি! তখনও তো বুঝি নি কি কান্ডটা হয়ে গেছে ততক্ষণে। বাসস্ট্যান্ডের কাছেই দিনহাটা হাইস্কুলের জনপ্রিয় শিক্ষক হরতোষ চক্রবর্তীকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে মা সন্তোষী। হরতোষবাবু বাঁচেন নি। আর সেই মহালয়ায় সারাদিন ধরে খন্ডযুদ্ধ হয়েছিল দিনহাটার লোকেদের সাথে থানার পুলিশদের। সারাদিন সেই খন্ডযুদ্ধ দেখে সন্ধ্যেবেলায় আমার আর বাবুনের বীরত্ব জাগলো বাড়ির উল্টোদিকের আমাদেরই বয়সী বুড়ির কথায়, “সব্বাই থানায় ঢিল ছুঁড়লো! আর তোরা বসে রইলি। তোরা কি ছেলে না মেয়ে?” পুরুষত্বকে অপমান! নৈব নৈব চ। অন্ধকারের সাহায্য নিয়ে ছুঁড়লাম ঢিল থানায়। পুলিশ তো। গন্ধ শুঁকে ঠিক হাজির। সুদীপকাকার মধ্যস্থতায় ছাড়া পেয়ে গেলাম। থানার পাশেই বাড়ি আমাদের। পুলিশরা সব বড়কাকা-সুদীপকাকার দোকান থেকেই মালপত্র নেন। তাই চেনা সবাইই। এক পুলিশকাকু হেসে বললেন, “আমাকে মারিস, কিন্তু থানাতে না।” কি লজ্জা কি লজ্জা!  পুরুষত্ব ততক্ষণে কয়েকদিন আগের বিশ্বকর্মা পূজাতে ওড়ানো কেটে যাওয়া ঘুড়ির মতো ভোঁ-কাট্টা!

         মহালয়া মানেই তখন সকালের বেড়ানোর পর জলখাবার খেয়ে প্রতিমার প্রস্তুতি দেখতে যাওয়া। তখনও প্রতিমার চোখ আঁকা হয় নি, সিংহের ল্যাজটা বাকি বা মহিষাসুরের মুন্ডু রোদে শুকোচ্ছে। চিন্তা হ’ত ঠিকঠাক সব হবে তো? বাকি তো মাঝে মাত্র সাতদিন! কি যেন কি এক ম্যাজিকে সব ঠিকঠাক হয়ে দেবী দুর্গা মন্ডপে মহিষাসুরকে নিয়ে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতেন। মহালয়ার সেই আধা রঙা, আধা তৈরী হওয়া দুর্গা এভাবে পাল্টে যাবে ভাবতেই পারতাম না!

                মহালয়া মানেই সেসময় দিনহাটা শুধু। মহালয়ার ওই বেড়ানোর টানেই ফালাকাটায় আসবার পরও ওই দিনটায় চলে যেতাম দিনহাটায়। আরও একটা ব্যাপার ছিল। বাবা-মা সব কাকাদের প্যান্ট-শার্টের পিস, কাকীমাদের শাড়ি কিনতেন এদিন। অবশ্যই ঠাকুরদা-ঠাকুমা, আমরা “পোলাপান”দেরটাও কেনা হত।  দিনহাটা চৌপথীতে বিশুমেসোর দোকান ‘পরিচ্ছদ’ আর ‘নারায়ণী ড্রেস হাউস’ থেকে নেওয়া হত মোটামুটি সব। সে এক কেনাকাটা বটে! একগাদা শাড়ী, একগাদা জামা প্যান্টের পিস দেখতে দেখতে বিশুমেসোর সাদা ফরাস পাতা গদিতে ঘুমিয়েও গেছি কোনও কোনও বার! তবে চনমনে হতাম নারায়ণীতে ঢুকলেই। এবার আমারটা হবে যে! বাবা মা বাদেও বড়কাকীমা দিতেন। আহা, নতুন জামার কি দারুন গন্ধ! এই দ্যাখ আমারটা পলেস্টারের জামা, তোরটা কি রে? এটাকে টার্কিস বলে তোরটা তো ছিটকাপড়!!

          সবটাই মহালয়ার দিনে। মন্ডপগুলোতে ব্যস্ততা। বড়কাকার দোকানে উপচে পড়া নতুন মাল, টিটবিট আলো রাস্তায়….

পুজো আসছে।

                   বড়কাকার ট্র্যানজিস্টারটা কবেই নষ্ট হয়ে গেছে। পাঁঠার মাংস খাওয়া ছেড়েছি অনেকদিন। জানিনা দিনহাটার সবাই আজও হাঁটতে বের হয় কিনা। বাবা-মা সবাইকে টাকা দিয়ে দেন এখন। পরিচ্ছদ দোকানটা, নারায়ণী ড্রেস হাউস উঠে গেছে। বড়কাকীমাও কিনে দেন না কিছু। বড়কাকার সাবেক দোকানের বদলে ওষুধের দোকান সামলায় ভাই।

                   প্যান্ডেলে তবু ব্যস্ততা। ঝলমলে আলো রাস্তায়।

পুজো আসছে…..