সমালোচনাকে পিছনে ফেলে সাফল্যের উচ্চ শিখরে নিশীথ, ৩৫শেই দেশের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী 

849

কোচবিহার, ৮ জুলাইঃ বিতর্ক যাই থাকুক না কেন সাফল্যের উচ্চ শিখরে তরতর করে উপড়ে উঠেছেন তিনি। প্রাথমিক শিক্ষক থেকে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে একেবারে দেশের স্বরাষ্ট্র দফতরের প্রতিমন্ত্রী। গতকাল সন্ধ্যায় দিল্লীর রাইসেনা হিলে অন্যান্য অনেকের সাথে মন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছেন কোচবিহারের সাংসদ নিশীথ প্রামাণিক। কোচবিহারের মত প্রত্যন্ত এলাকার থেকে দিল্লীর দরবারে মন্ত্রী পদে বসা নিশীথ প্রামাণিককে নিয়ে স্যোসাল মিডিয়ায় চর্চাও হচ্ছে ব্যাপক ভাবে। তাতে প্রত্যন্ত এই জেলা থেকে গিয়ে দেশের স্বরাষ্ট্র দফতরের প্রতিমন্ত্রী পদে বসায় অনেকেই যেমন খুশির কথা উল্লেখ করেছেন। আবার অনেকেই তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা সহ বেশ কিছু মামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সমালোচনাও করেছেন। অনেকেই আবার বলেছেন, সমালোচনা তো সবাইকে নিয়েই হয়। কিন্তু এত কম বয়সে প্রত্যন্ত এই এলাকা থেকে গিয়ে দেশের স্বরাষ্ট্র দফতরের প্রতিমন্ত্রী হওয়া কম কথা নয়।

দিনহাটার ভেটাগুড়ির বাসিন্দা নিশীথ প্রামাণিক। এক সময় তৃণমূল কংগ্রেসের হাত ধরেই তাঁর রাজনীতিতে হাতে খড়ি হয়েছিল। তৎকালীন তৃণমূল যুব কংগ্রেস সভাপতি প্রয়াত রানা বোসের ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত ছিলেন নিশীথ। রানা বোসের মাধ্যমেই তৃণমূল যুব কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছাকাছি এসেছিলেন তিনি। রানা বোসের মৃত্যুর পর তৃণমূল যুব কংগ্রেসের জেলা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়ে গোটা জেলা সংগঠন চালিয়েছেন তিনি। এরমধ্যেই ২০১৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভেটাগুড়ি থেকে পঞ্চায়েত সদস্য পদে লড়াই করে উপ প্রধান হয়েছিলেন।

পেশায় প্রাথমিক শিক্ষক হলেও সংগঠন তৈরিতে তিনি যে অনেক বেশি পটু, ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে তিনি তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। তৃণমূল কংগ্রেসে থেকেও প্যারালাল সংগঠন তৈরি করে দিনহাটা সহ কোচবিহার জেলার বেশ কিছু এলাকায় কার্যত দলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নির্দল হয়ে লড়াই করিয়ে তাঁর বহু অনুগামীকে জিতিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। বেশ কিছু গ্রাম পঞ্চায়েত, একটি পঞ্চায়েত সমিতি তাঁর অনুগামীদের দখলে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর এক অনুগামীকে জেলা পরিষদের একটি আসন থেকে প্রার্থী জিতিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।

সেই সময়কার কোচবিহার জেলায় তৃনমূলের মাদার- যুব’র লড়াই গোটা রাজ্য রাজনীতিতে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছিল। আর সেই খবর রাজ্য নেতৃত্বের কাছে পৌছতেই তাঁকে বহিষ্কারের সিধান্ত নেয় তৃণমূল নেতৃত্ব। আচমকাই তৎকালীন জেলা তৃণমূল যুব সভাপতি পার্থ প্রতিম রায়কে দিয়ে নিশীথ প্রামাণিকের বহিষ্কারের ঘোষণা করা হয়। এরপরেই নিশীথের রাজনীতিতে নতুন মোড় তৈরি হয়।

দিল্লিতে অনুগামীদের নিয়ে গিয়ে বিজেপিতে যোগ দেন নিশীথ প্রামাণিক। তাঁর বিজেপিতে যোগের কিছু দিনের মধ্যেই লোকসভা নির্বাচন। তখন বিজেপির জেলা নেতৃত্বের একটা বড় অংশ আপত্তি জানালেও শেষ পর্যন্ত কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্র থেকে তাঁর প্রার্থী হওয়া আটকাতে পারেন নি কেউ। বরং কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অনেক বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন নিশীথ প্রামাণিকের প্রচারে। এসেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহের মত নেতৃত্বরা। আর প্রাথমবার লোকসভার মত আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।

শুধু তাই নয়, ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় বেশ কয়েকজন সাংসদকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। এরমধ্যে নিশীথ প্রামাণিক দিনহাটা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দিনহাটার ডাকসাইটে তৃণমূল নেতা উদয়ন গুহ। জোর লড়াই দিয়ে সামান্য ভোটে হলেও জয়ী হয়েছেন নিশীথ। যদিও শেষ পর্যন্ত বিধানসভা থেকে পদত্যাগ করে সাংসদই থেকে গিয়েছেন তিনি। আর যুব নেতার পরপর এই সাফল্যকে মান্যতা দিতে এবার মন্ত্রী সভায় জায়গা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

একদিকে ভোটের প্রচারে যেমন তৃণমূল নেতারা নিশীথ প্রামাণিকের বিরুদ্ধে সোনার দোকানে ডাকাতি, ব্যাংক ডাকাতি সহ নানান অভিযোগের কথা তুলে ধরেছেন। তেমনি এবার রাজ্যে তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এসে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের পুলিশ সেই সব পুরানো মামলা আবার নতুন করে তদন্তের কাজ যখন শুরু করেছে, ঠিক তখনই কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনীর মন্ত্রী হলেন নিশীথ প্রামাণিক। সমস্ত সমালোচনার মুখে ছাই দিয়ে তিনি যে তরতর করেই সাফল্যের উচ্চ শিখরে পৌঁছে গিয়েছেন, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।