কল্যাণময় দাস

এনআরসি ইস্যু এখন বাংলার রাজনীতিতেও দারুণ ভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। অসমের ১৯ লক্ষেরও বেশী মানুষের নাগরিকত্ব হারানোর কথা তুলে ধরে বাংলায় এনআরসির বিরোধিতায় নেমেছে তৃণমূল-বাম সহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল। এনআরসির জন্য বিজেপিকে দায়ী করে নেওয়া হচ্ছে একাধিক আন্দোলন কর্মসূচী। তবে এই আন্দোলন গুলোতে এনআরসি হলে বাংলার মানুষ কতটা বিপদে পড়বে, তা যতটা বড় করে তুলে ধরা হচ্ছে। ততটাই গৌণ থাকছে সদ্য নাগরিকত্ব হারানো অসমের লক্ষ লক্ষ মানুষের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার দাবীর প্রসঙ্গ। তৃণমূল নেত্রী বলেছেন, তিনি বেঁচে থাকতে বাংলায় এনআরসি করতে দেবেন না। বাম নেতাদেরও প্রায় একই রকম বক্তব্য।

   

এনআরসি বিরোধিতায় তৃণমূলের আন্দোলন কর্মসূচী

এই রাজ্যে এনআরসি বিরোধী আন্দোলনে বাম- তৃণমূল রাজনৈতিক ভাবে কিছুটা সুফল যে পাচ্ছে, সেটা যে কোন রাজনৈতিক সচেতন মানুষ বুঝতে পারছেন। আসলে লোকসভা নির্বাচন ও তার পরবর্তী কিছুটা সময় পর্যন্ত সাংগঠনিক ভাবে এরাজ্যেও চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল বিজেপি। মোদ্দা কথা এই বাংলাতেও হিন্দু ভোটকে অনেকটাই এক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিল তারা। আর এতেই রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে ক্ষমতা হারানোর ভয় ঢুকে গিয়েছিল। কিন্তু এনআরসি ইস্যু আবার অনেকটাই শক্তি ফিরিয়ে দিয়েছে তৃণমূলকে। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি এই ইস্যুকে সামনে রেখে কোচবিহারে সিপিআইএমের মিছিল হয়েছে। সেখানে মানুষের ঢল বুঝিয়ে দিয়েছে এই ওষুধে তাদেরও হিমোগ্লোবিন কিছুটা বেড়েছে। এতে তৃণমূল যেমন ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দখতে শুরু করেছে। তেমনি বামেরাও ২১ না হলেও ২৬ এর লক্ষ্যে এগোতে চাইছে। কিন্তু ২১ এর নির্বাচনের পাটিগণিত এত সহজ ভাবে হবে না। ভোটের আগে বিজেপির আরও অনেক মোক্ষম চাল আমরা দেখতে পাবো। দেখতে পাবো রাজ্যের শাসক দলের অনেক কর্মকাণ্ড। সেসব নিয়ে আলোকপাত করবো। তবে তার আগে একটু এনআরসি প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করা যাক।

দেশ ভাগের মাশুল বাঙালি হিন্দুদের মারাত্মক ভাবে দিতে হয়েছিল। শুধু ৭১ সালেই নয়, তার আগে ও পরে নিপীড়িত-নিগৃহীত-লাঞ্ছিত হয়ে নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়ে লক্ষ লক্ষ বাঙালি হিন্দুকে চলে আসতে হয়েছে এদেশে। পরবর্তীতে আর্থিক কারনে কিছু বাংলাদেশী মুসলমানও এসেছেন, কিন্তু সেটা সংখ্যায় কম। এটা বোঝা যায় ভাষা দিয়ে। আমরা যারা উত্তরবঙ্গের কোচবিহার জলপাইগুড়ি আলিপুরদুয়ার এলাকার মানুষ তাঁরা জানি, এখানে পূর্ববঙ্গীয় টানে বাংলা উচ্চারণ করা মুসলিম প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। কিন্তু আমাদের একদম প্রতিবেশী অসমের ধুবরি সহ সংলগ্ন বেশ কিছু এলাকায় স্থানীয় উচ্চারণে কথা বলা মুসলমানদের পাশাপাশি পূর্ববঙ্গীয় টানে কথা বলা মুসলমানদের দেখা যায় বেশ ভালো সংখ্যাতে। বলা হয়ে থাকে অসমে এনআরসি বিষয়টি যখন উঠে এসেছিল, সেই রাজীব গান্ধীর সময়, তখন বাঙালি উদ্বাস্তুদের তাড়ানোই ছিল মূল লক্ষ্য। কিন্তু পরবর্তীতে এনআরসির মাধ্যমে ওপাড় থেকে আসা মুসলমানদের তাড়ানোই মূল লক্ষ্য বলে প্রচার করা হল। (যা এখন এই বাংলাতে বিজেপি নেতা নেত্রীরা করে যাচ্ছেন।) সেই কারণে অসমের রাজনীতিতে ওপাড় থেকে আসা বাঙালি হিন্দুরা বিজেপির সঙ্গ দিল। কারণ যাদের জন্য ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে, তাঁদের আবার এখানে সহ্য করে নিতে পারছিলেন না যে। কিন্তু হতভাগা বাঙালি হিন্দুদের কপালে যা জোটার তাই জুটল। 

পরিসংখ্যান বলছে- অসম এনআরসিতে যেখানে ৩ কোটি ১১ লক্ষ ২১ হাজার ৪ জন মানুষের জায়গা হয়েছে। সেখানে বাদ পড়েছেন মোট ১৯ লক্ষ ৬ হাজার ৬৫৭ জন। এরমধ্যে ১৪ লক্ষের বেশী হিন্দু, ১১ লক্ষেরও বেশী হিন্দু বাঙালি। মুসলিম বাঙালিও রয়েছে বড় সংখ্যায়। শুধু তাই নয়, তালিকায় নাম নেই স্থানীয় অনেক আদিবাসিন্দা উপজাতি জনগোষ্ঠীর লোকজনদেরও। যা নিয়ে এনআরসি প্রক্রিয়ায় সঠিক ভাবে কাজ হয়েছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সে যাইহোক অসমে এখন আন্দোলন হচ্ছে আদবাসি জনগোষ্ঠীর লোকদের কোন প্রমাণপত্র ছাড়াই নাগরিকত্ব দেওয়ার। কিন্তু অসমে বাঙালিদের নিয়ে তেমন বড় ধরণের কোন আন্দোলন সংগঠিত হতে দেখা যাচ্ছে না। বিজেপির দাবী, দেশ ভাগের ফলে পাকিস্থান, আফগানিস্থান ও বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে যে হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, পার্সি, শিখ ভারতে চলে এসেছে, তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য ২০১৬ সালের ১৯ জুলাই লোকসভায় একটি সংশোধনী বিল আনা হয়েছিল। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস বামফ্রন্ট সহ বেশ কিছু দল বিরোধিতা করেছিল। সেই বিরোধিতার জন্য ঐ বিলটি সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারিতে কমিটি রিপোর্ট জমা দেয়। পরেরদিন লোকসভায় বিল পাশ হয়। কিন্তু রাজ্যসভায় বিজেপি সংখ্যালঘু থাকায় ঐ বিলটি পাশ করিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়। বিজেপি নেতৃত্বের দাবী, বিরোধীদের বিরোধীতায় বিলটি পাশ না হওয়ার জন্য অসমের এনআরসি থেকে বাদ পড়া বাঙালি হিন্দুদের নতুন করে নাগরিকত্ব পেতে বিলম্ব হচ্ছে। পাশাপাশি ১২০ দিন সময় দিয়ে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে এনআরসি ছুটদের। এরপর উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকবে তাঁদের। তারপরেও না হলে ডিটেনশন ক্যাম্প। যা ইতিমধ্যেই তৈরির কাজ শুরু হয়ে গেছে।

গোয়ালপাড়ার সেই ডিটেনশন ক্যাম্প

আমাদের খুব কাছে অসমের গোয়ালপাড়ায় একটা ডিটেনশন ক্যাম্পের কাজ চলছে। ক্যাম্প বলতে বড় ধরণের জেলখানা বললেও খুব একটা ভুল বলা হবে না। গোয়ালপাড়ার সেই ক্যাম্পে ৩ হাজার নাগরিকত্ব হারানো মানুষকে রাখা হবে। আরও বেশ কিছু ক্যাম্প হবে অসম জুড়ে। যেখানে নাগরিকত্ব হারানো মানুষ গুলোকে বন্দি অবস্থায় থাকতে হবে। একজন খুনিরও সাজা হলে শাস্তি পাওয়ার একটা নির্দিষ্ট  সময়সীমা থাকে। কিন্তু এখানে কাকে কতদিন পর্যন্ত থাকতে হবে, তার কোন উত্তর নেই। ভাবুন তো একবার, দেশভাগ বাঙালিকে কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে? সেই গাছপালা ঘেরা বাড়িঘড়, ধানের গোলা, গরুবাছুর, চাষের জমি, খালবিল, আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশী সব কিছু ফেলে এসে আজ জেল বন্দি হওয়ার মুখে এনে দাঁড় করিয়ে রেখেছে!

এই ভয়টাকেই এরাজ্যে কাজে লাগিয়ে ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনের বৈতরণী পাড় করতে চায় শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। বামেরাও নিজেরদের সংগঠন বাড়াতে চায়। সেটাতে ঐ দুই দলই সাময়িক ভাবে সফল হয়েছে বলা যেতে পারে। আর তা যে বিজেপি নেতৃত্ব বোঝেন নি, তা নয়। বঙ্গবিজেপি নেতৃত্বরা তো বটেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছেও বাংলার হিন্দু বাঙালির এই উদ্বেগের কথা পৌঁছে গিয়েছে। আর সেই কথাকে মাথায় রেখে বিজেপি নতুন করে রণকৌশল তৈরি করছে। এখন লোকসভার পাশাপাশি রাজ্য সভাতেও সংখ্যাগুরু বিজেপি। তাই এখন আর নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাশ করাতে অসুবিধে নেই বিজেপির। আগামী শীতকালীন অধিবেশনেই ঐ বিল পাশ করিয়ে নেওয়া হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাপক ভাবে প্রচার দেওয়া হতে পারে নাগরিকত্ব হীন হয়ে পড়া বাঙালি হিন্দুদের নাগরিক করে নিতেই এই বিল পাশ করানো হল। যা বাংলার বাঙালিদের মনে ফের সাহস জুগিয়ে তুলবে। আবেগ জন্মাবে বিজেপির প্রতি। বিজেপির এই রণকৌশল হবে তৃণমূল ও বামেদের ব্যবহার করা অস্ত্র দিয়েই তাঁদের কোণঠাসা করা। বঙ্গ বিজেপির অনেক নেতাই মনে করছেন, এইটুকু করলেই কেল্লাফতে। ২১ এর নির্বাচনে রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পথ যেমন সুগম হবে। তেমনি বাংলায় এনআরসি করিয়ে নেওয়াও সম্ভব হবে।  

যদিও তৃণমূল কংগ্রেসও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না, তা বলাই যেতে পারে। তাঁদের থিংকট্যাঙ্ক প্রশান্ত কিশোর নিশ্চিত ভাবে কোন পাল্টা রণকৌশল তৈরি করবেন। ময়দানে নামবে বাম-কংগ্রেসও। সব মিলিয়ে ২১ এর বিধানসভা নির্বাচন যে এনআরসি আর বাঙালি নিয়ে জমে উঠবে, তা বলাই যেতে পারে।