রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সভাসমিতিও কিন্তু করোনা সংক্রমণে কম দায়ী নয়!

123
লেখকঃ
শৌভিক রায়

অতিমারী করোনা কালে আমাদের জীবন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। মাত্র পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যে লকডাউন, আনলক, কোয়ারিনটিন, আইসলোশেন ইত্যাদি শব্দগুলি আমাদের নিত্য ব্যবহারে ঢুকে পড়েছে। মাস্ক, স্যানিটাইজার ইত্যাদি হয়ে উঠেছে প্রতিদিনের ব্যবহার্য সামগ্রী। জীবন বইছে অন্য খাতে। ভবিষ্যত অজানা। কেউই জানি না যে, আগামী দিন কোনও শুভ বার্তা আনবে, নাকি এভাবেই এক অনিশ্চিত আশঙ্কায় জর্জরিত হয়েই কাটবে আমাদের বাকি দিনগুলি।

ইতিমধ্যেই দেশের অর্থনীতি তলানিতে ঠেকেছে। অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ হারিয়েছেন বহু মানুষ। সংগঠিত ক্ষেত্রের অবস্থাও খুব একটা ভাল না। সরকারীভাবে সুস্থিত অর্থনৈতিক পরিবেশের নানা বার্তা দেওয়া হলেও, জিডিপি কিন্তু অন্য কথা বলছে। পাল্লা ঝুঁকছে বেসরকারীকরণের দিকে। বেকারত্বের সূচক উর্ধগামী। সব মিলে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যা অত্যন্ত হতাশার ও ভয়ের। এই হতাশা ও ভয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে আমাদের কান্ডজ্ঞানহীন আচরণ এবং তার জন্য সিংহভাগ দায় কিন্তু দেশের রাজনৈতিক নেতাদেরকেই নিতে হবে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের দেশ বহু সময় পেয়েছিল। WHO-এর বারংবার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও তখন আমরা কর্ণপাত করিনি। বরং ঢাকঢোল পিটিয়ে, অন্য রাষ্ট্র কর্তৃক আয়োজিত মহাসভার প্রতিদান দিতে করতে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশ ঘটিয়েছি দেশের করদাতাদের পয়সায়। তাতে নিজের ক্ষমতা বোঝানো গেলেও, আখেরে যে ব্যাপারটি বুমেরাং হয়েছে সেটা আজ বোঝা যাচ্ছে। একইভাবে, প্রশ্ন জাগছে যে, সংক্রমণ শুরুর কালে কীভাবে একটি বিশেষ সম্প্রদায় দেশ-বিদেশের নানা মানুষকে নিয়ে ধর্মীয় সভা করবার অনুমতি পেল? সেই মুহূর্তে এই সভা করবার যৌক্তিকতা কতটা ছিল, সেটা যেমন সেই ধর্মীয় নেতারা বলতে পারবেন না, ঠিক তেমনই যারা অনুমতি দিলেন, তারাও দায় এড়াতে পারবেন না। সভা হয়ে যাওয়ার পর, অর্থাৎ তক্তায় পেরেকটি পুঁতবার পর, ধরপাকড় বা আলাদা করে চিহ্নিত করা যে খুব বেশি লাভজনক হয় নি তার প্রমাণ তো আমরা প্রতিনিয়ত পাচ্ছি। একই কথা বলা যেতে পারে মহাসভা সম্পর্কেও। ভুল উচ্চারণে দেশের বিখ্যাত মানুষদের নাম শুনতে সেদিন যারা জমা হয়েছিলেন, তারাও ওই তক্তায় পোঁতা পেরেকটিকে শক্তই করেছেন। আর আজ তার ফল ভুগছে দেশের অগণিত সাধারণ মানুষ।

আন্তর্জাতিক উড়ানে নিষেধাজ্ঞা জারি না করা, প্রয়োজনীয় সময় না দিয়ে লকডাউন ঘোষণা করা, ভিন রাজ্যে থাকা শ্রমিকদের নিজগৃহে ফিরতে যথাযথ ব্যবস্থা না করা, ভিন রাজ্য থেকে ঘরে ফিরলে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা কঠোরভাবে না নেওয়া ইত্যাকার ব্যাপারগুলি এত সহজে করা গেছে যে, করোনা আজ মহামারী হয়ে গোষ্ঠী সংক্রমণের পথে যাত্রা শুরু করেছে। আমরা ভয়ে মরছি কখন কী হবে সেকথা ভেবে। আর আমাদের সেই আশঙ্কার মধ্যেই একটা ব্যাপার আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, এই করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সভা-সমাবেশের কিন্তু কোনও খামতি দেখা যাচ্ছে না। বুঝতে পারছি না যে, কতটা মারাত্মক হতে পারে এই সভাসমাবেশগুলি। কেননা করোনা সংক্রমণের শৃঙ্খলকে আটকানোর জন্য যে দৈহিক দূরত্ব দরকার হয়, তা এইসব সভাসমাবেশে আদৌ মানা হচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে না সামান্যতম সতর্কবিধি। মাস্ক ছাড়া রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে ধর্মীয় শিষ্যশিষ্যাদের ভিড়ে সমস্ত বিধি শিকেয় উঠেছে। এরা ভুলে যাচ্ছেন যে, না তাদের নেতার ভাষণে বা গুরুদেবের মন্ত্রে করোনা কাছে ঘেঁষবে না। করোনা সংক্রমণকে আটকাতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ও কার্যকরী উপায় হল দৈহিক ও সামাজিক দূরত্ব। কিন্তু এইসব সভায় তা একেবারেই মানা হচ্ছে না। লকডাউন পিরিয়ডে এই জাতীয় সভাসমিতি তাও খানিকটা কম থাকলে, আনলক পর্ব শুরু হতে না হতেই প্রতিটি রাজনৈতিক দল ময়দানে নেমে পড়েছিলেন ছোট ছোট সভাসমিতির মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে। তাছাড়াও, এই ক্রান্তিকালে তারা যে আমজনতার পাশে আছেন, সেটা দেখানোর তাগিদও তাদের মধ্যে ছিল। এমনিতেই নানা মানুষ পরিবৃত হয়ে চলাটা আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের অভ্যেস। তাই যেখানে ভ্যাকসিন ছাড়া, দৈহিক দূরত্ব একমাত্র ওষুধ, সেখানে নিয়মটি মানাই হয় নি। একই কথা ধর্মীয় গুরুদের ক্ষেত্রেও সত্যি। ফলে, সংক্রমণের গ্রাফ নিম্নমুখী না হয়ে আজ এমন উড়ান দিয়েছে যে, আমাদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। আমরা আবার হাঁটতে চলেছি লকডাউনের পথে।

অথচ এখন পুনরায় লকডাউন কোনোভাবে কাম্য ছিল না। প্রাইভেট সেক্টরে কাজ করেন এমন বহু মানুষকে জানি, যারা নতুন করে শুরু হতে চলা এই লকডাউনের ফলে প্রবল অসুবিধায় পড়তে চলেছেন। এমনিতেই কাজ হারিয়ে বহু মানুষ আক্ষরিক অর্থে একদম বসে পড়েছেন। আনলক পর্ব শুরু হতে তারা তবু কিঞ্চিৎ আশার আলো দেখছিলেন। কিন্তু সে আশায় জল ঢেলে দিয়েছে আমাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা ও হঠকারীতা। সভা-সমাবেশগুলিতে, তা সে ভার্চুয়াল বা রিয়াল যা হ’ক না কেন, আমাদের জমায়েত ও আচরণ প্রমাণ করছে যে, আমরা যেমন অন্যদের ভাল বুঝি না, তেমনি নিজেদেরটাও বুঝি না। আর এই ব্যাপারে সকলেই, কি ডান, কি বাম, সমান।

তবে শুধুমাত্র রাজনৈতিক সভাসমিতি বা ধর্মীয় সমাবেশকে দায়ী করলে সত্যের অপলাপ হবে। আমরা সাধারণ মানুষরাও কম যাই না। আমাদের নিজেদের আচরণও কম আশ্চর্যের নয়। বারংবার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আমরা অকারণ ভিড় বাড়িয়েছি সর্বত্র। বাজার থেকে শুরু করে পাড়ার আড্ডায় পর্যন্ত যেভাবে আমরা হাস্যকর আচরণ করছি, তাতে সন্দেহ হয় যে, আমরা আদৌ সচেতন কিনা! যে মানুষেরা এভাবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে পারে, তারা রাজনৈতিক বা ধর্মীয় সভা সমাবেশে যে ভিড় জমাবে তা তো বলাই বাহুল্য। কেননা, আমাদের দেশে দলিত স্বামী-স্ত্রীকে মাঠে-ময়দানে বেধড়ক লাঠি মারা গেলেও, এই জাতীয় সভা-সমিতিকে আটকাবার নৈতিক সাহস কারও হয় না। মহামারী আইনটি তারা সাধারণ জনগনের ওপর প্রয়োগ করা হলেও, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতানেত্রীদের ওপর তা লাঘু হচ্ছে, সেটা আমরা ভাবতেও পারি না। সর্বোপরি, মনে রাখতে হবে যে, একজন সাধারণ মানুষের যেমন করোনা সংক্রমণ কাম্য নয়, তেমনি একজন রাজনৈতিক বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বেরও সেরকম হ’ক, কেউ চান না। তাছাড়া, আমাদের মতো দেশে চিকিৎসার অপ্রতুলতা থাকায় সংক্রমণ হলে যে সঠিক চিকিৎসা পাওয়া যাবে তার গ্যারান্টিও নেই। সবার পক্ষে শিলিগুড়ি বা কলকাতায় যাওয়াও সম্ভব না। তাই নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভীড় এড়িয়ে চলা, দৈহিক দূরত্ব বজায় রাখা।

এই অবস্থা একদিন কাটবে। আমরা সকলেই জানি। জীবন আবার তার স্বাভাবিক ছন্দে এটাও হয়ত ঠিক। কিন্তু আমাদের মনে ভয় ও আশঙ্কার যে ক্ষত সৃষ্টি হল, তার থেকে মুক্তি হয়ত আমাদের জীবদ্দশায় আর হবে না। সেই আশঙ্কা ও ভয়কে দ্বিগুণ করে তুলছে অপরিকল্পিত-নিয়ম না মানা সভা সমাবেশ। কবে আমরা এর থেকে পরিত্রাণ পাব, তার উত্তর আমাদের সদিচ্ছা দিতে পারবে।