লেখিকাঃ অঞ্জনা দে ভৌমিক

উৎসব সম্প্রীতির মিলনক্ষেত্র। উৎসবের এ আনন্দযজ্ঞে সামিল হতে নাস্তিক চলে আস্তিকের হাত ধরে। প্রতিটি প্রাণে আসে জীবন শক্তির জোয়ার।

মানবতা আজ নির্যাতিত, ভূলুণ্ঠিত। তাই আজ দরকার শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের একতা বদ্ধ হয়ে আসুরী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা।নির্যাতিত ,ভূলণ্ঠিত মানবতাকে  রক্ষা করা। মানবিক বিকাশ উণ্ণততর করে সৃজনশীলতা। সাহিত্য শিল্পের মধ্যেই মানুষের সত্যের চিরন্তন সন্ধান।

দুর্গোৎসব সমাগত। বাংলার ঘরে ঘরে ম ম করছে দুর্গাপূজার গন্ধ। শরতের শিউলি ভোরের উঠোনে। ঊমা আসছে বাংলার ঘরে। বাঙালীর মণে ঊমাকে বড়ণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি। মায়ের আগমনী বার্তায় পাঠকদের হাতে হাতে শারদ সংখ্যা। শরতের সাদা মেঘের সাথে সকালের চায়ের কাপের সাথে বাঙালীর কথা। সুদূর কোলকাতা থেকে আমাদের শহর কোচবিহারে পৌঁছে যায় দেশ, আনন্দ মেলা, নবকল্লোল পত্রিকা। তাঁর সাথে কোচবিহার থেকে প্রকাশিত অনেক পত্রিকা, নতুন নতুন কবিতা ও গল্প নিয়ে হাজির লেখকেরা। পাঠকেরাও উন্মুখ হয়ে থাকেন, বই হাতে পাওয়ার অপেক্ষায়। আধুনিক বাংলা সাহিত্য এ সময়ে সবটাই হয় দুর্গাপূজার  আবহে। এই সংস্কৃতির সাথে মানুষের হয় মেলবন্ধন।

দুর্গাপূজা বর্তমানে বাঙ্গালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। দুর্গাপুজার মাহত্ম্য, প্রাচীনত্ব, আদর্শ বা বিনোদন নিয়ে বাঙ্গালির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না। দেবী দুর্গার উৎপত্তি    বেদ পরবর্তী যুগে। বেদের পাতায় কোথাও দুর্গার নাম নেই।

দুর্গাকে আমরা পাই নারায়ন উপনিষদে- তৈত্তিরীয় অরণ্যকে পাতায়। তবে ধর্মগুরুর মতে দুর্গার পূজা বহু কাল আগে থেকেই উপমহাদেশের লোকেরা করে আসছে, তবে  ভিন্ন নামে, ভিন্ন রূপে। পাক- আর্য সমাজ কৃষিজ উৎপাদনের উৎস রূপে মতো   পৃথিবী পরবর্তী আর্য সমাজে অম্বিকারুপি দুর্গাতে পরিণত হয়েছেন। বৈদিক যুগের পর যখন এশিয় মাইনর এলাকা থেকে যাযাবর মেষপালক গোষ্ঠী স্থায়ী বসিত গড়ে পাঞ্জাবে, তখন থেকেই অনার্যদের সাথে সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব ও মিথস্ক্রিয়া তৈরি হয়। যার ফলে অনার্যদের লোকায়ত স্তরে কিছু দেব দেবীর আর্যিকরন ঘটে।

দেবী দুর্গার কোন জন্ম ইতিহাস পাওয়া যায় না। দুর্গার তাৎক্ষণিক ভাবে অসুরবধের ঊদ্দ্যেশে উৎপত্তির গল্প ছাড়া। আনুমানিক খৃঃ পূর্বঃ দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় খৃষ্টাব্দের মধ্যভাগ পর্যন্ত পারস্যের সাথে ব্যবসা আর ভাবের আদান প্রদানের কারনেই সিংহবাহিনী দুর্গার জন্ম। মহাভারতে দুর্গা যশোদার কন্যা, কংসধ্বংসকারিণী কুমারী মদমাংসপ্রিয়া। মহাভারতেই পাওয়া যায় অর্জুন আর যুধিষ্ঠিরের দুর্গার আরাধনা।

বাংলায় দুর্গাপূজা বলতে ১৬১০ সালের লক্ষীকান্ত মজুমদারের পূজোকেই বোঝায়। এসময়ে প্রভাবশালী জমিদার সামন্তরাজরা ইংরেজদের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখার জন্য এ পূজা করেন। আঠারো উনিশ শতকের শুরুতে ছিল পারবারিক, অভিজাতদের মাঝে। সে সময়ে গোত্র, বর্ণ, দ্বন্দে বিভক্ত ছিল মানুষ। তাই দুর্গাপূজা সে সময়ে সার্বজনীন হয়ে উঠতে পারেনি। দুর্গাপূজা জনপ্রিয় ও ও সার্বজনীন হয়ে উঠার জন্য বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। উনিশ শতকের গোঁড়ার দিকে আজকে সাবেকিয়ানা বলে মনে করি, দেবী মূর্তি আর সালাংকারা রূপে করতেন। মাতৃরূপে নানা আঙ্গিকে তৈরি করা দুর্গার মূর্তি। স্বর্গের দেবতার রূপ কল্পনা করে শিল্পী তাদের ভাবধারাকে ফুটিয়ে তুলতেন প্রতিমায়। প্রাকৃতিক রঙ দিয়ে আঁকা হতো শাড়ি ও গয়না।

আজ সাবেকিয়ানাকে অনেকটা দূরে সরিয়ে দুর্গাপূজো  প্রযুক্তি  আর বানিজ্যের মায়াজালে বহুমুখিনতা  লাভ করছে। তবে আজকের সময়ে পূজোর কেনাকাটা, ভ্রমণ, আমোদ প্রমোদ এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। এর সাথে আছে সাহিত্যপ্রেমী মানুষের এক উন্মাদনা। নতুন নতুন বইয়ের সমাহার। বইপাড়াতেও  চলে কেনাকাটার ভিড়। পূজাসংখ্যার পত্রিকা, বই, গল্প, কারো হাতে উপন্যাস।

দুর্গাপূজা এক উৎসব। পূজো মানেই হুল্লোড়। পূজা মানেই সকলের মিলন, ভাবের আদান প্রদান।  দুর্গাপূজো এক মহামিলন তীর্থ যাত্রা। সাহিত্য শিল্পের হাত ধরে বহির্মুখী অন্তর্মুখী অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতিক হোক এই দুর্গোৎসব।