লেখিকাঃ শ্রী পর্না দত্ত

দুর্গা পুজোতে, বাহার-আহার-বিহারের পাশাপাশি চার নম্বর শব্দটি হল – প্রেম। প্রেমের আবার রকম আছে। যেমন, যাকে সারাবছর স্কুলের পোশাকে কিংবা একটা জিন্স আর টি-শার্ট বা টপ্ পরে দেখতে পাওয়া যেত — পুজোর ভীড়ে তাকে একটা হলুদ অথবা গোলাপী জামদানিতে রূপকথার রাজকন্যার মতো লাগে।

বিতানকে একঝলক দেখার প্রত্যাশায় তার জন্য নিজের পাড়ার প্যান্ডেল ছেড়ে অর্কর বেপাড়ার মন্ডপের দোড়গোরায় ঘন্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়ার নামই বোধহয় পুজোর প্রেম। নিত্যযাত্রী হিসেবে সেও আমার বাসেই রোজ মাথাভাঙ্গার পথে যাতায়াত করত। মাঝপথেই তাঁর যাত্রা শেষ হয়ে যেত। তাঁকে দেখলেই বুকের ভিতরটা কেমন যেন গুড়গুড় করে উঠত। মাথাভাঙ্গা থেকে ফেরার পথে পাশের যাত্রী নিশিগঞ্জে নামলে একটা প্রচ্ছন্ন স্বস্তি পেতাম – যাতে সে উঠে বসতে পারে এই সিটে। ভাগ্যের পরিহাসে ব্যর্থতাই বেশীর ভাগ, সাফল্য মাত্র দুই একবার মাত্র ।

অষ্টমীর সকালে নতুন ‘পার্ক অ্যাভিনিউ ডিও’ সারা গায়ে ছড়িয়ে কুন্তল রামকৃষ্ণ মঠে যখন পৌঁছালো তখন অঞ্জলির ঘোষণা হচ্ছে । ভীড় ঠেলে একটু এগোতেই মন্ত্র শুরু — এদিক ওদিক তাকাতাকি করছিল কুন্তল একটু ফুল আর একটুকরো বেলপাতার জন্য। “এই নিন – আর পাঞ্জাবিতে আপনাকে অন্যরকম লাগছে “। মনে হলো – নিজেকেই চিমটি কেটে দেখি – স্বপ্ন নয় তো? চিনতে পারছেন না? আমি মধুপী। রোজ একই বাসে তো ট্রাভেল করি। কুন্তলের কানে যেন হাজার মৌমাছি গুনগুন করে উঠেছিল। তারপর, কি করে যে ঘন্টা দুয়েক কেটেছিল দুজনের কেউই বোধহয় বুঝতে পারেনি। এবছর কুন্তল- মধুপী-র বিয়ের পর প্রথম পূজা । দেখা যাক প্রেম, পরিণয়ে পরিনতি পেলে পূজায় কেমন কাটে।

ছবি সংগৃহীত

একসাথে ইংরেজি অনার্স নিয়ে পড়তো দেবাশিস আর সুদেষ্ণা। দুবছর ঠিকঠাক চলার পরই একদিন ভবানী সিনেমা হল থেকে দুজনকে একসাথে দেখে ফেলে সুদেষ্ণার পিসি। তারপর, তড়িঘড়ি করে পাত্র দেখে কোচবিহার থেকে দূরে ভুপালে প্রবাসী বাঙালির ঘরে বউ হয়ে গিয়েছিল সুদেষ্ণা। আজ এত বছর পর, মৈত্রী সঙ্ঘের ঠাকুর দেখতে গিয়ে চমকে উঠল দেবাশিস। আইসক্রিমের দোকানে সুদেষ্ণা, সাথে জিন্স-টপ পরা এক কিশোরী। সুদেষ্ণার মেয়ে মনে হচ্ছে। একটু সঙ্কোচ আর একরাশ কৌতূহল নিয়েই দেবাশিস এগিয়ে গেল। চিনতে পেরেছো, কবে এলে, তোমার মেয়ে নিশ্চয়ই! কী নাম তোমার, কোন ক্লাসে পড়? আমার ছেলে – এই নাম বল , ক্লাস ফোর। একদমে সব গুলো প্রশ্ন করে ফেলল দেবাশিস। তন্বী থেকে পৃথুলা সুদেষ্ণা অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। এরপর থেকে প্রতি বছর, মৈত্রী সঙ্ঘের পূজা যেন আলাদা করে টানে দেবাশিস কে । হয়তো ঠাকুর দেখার সাথে আর কাউকে খোঁজে তাঁর চোখ । তিন বছর আগের ঘটনা। তখন টেনশনেই ফোন নম্বরটা নেওয়া হয়নি – তাই। আবার- শঙ্খ , দেবরাজ, সৌমিলী,রাজন্যাদের মতো অনেকেরই — অনেককে খুঁজে পাওয়া হয় সেলফি সৌজন্যে। একদল ছেলেমেয়েদের ভীড়ে বিশেষ বন্ধু বা বান্ধবী যদি বড়দেবী মন্দিরের প্রাঙ্গনে কিংবা মদনমোহন বাড়িতে ছবিটা তোলার সময় পাশে থাকে, তবে ক্রপ্ করে সেটা প্রথমে ডিপি-তে জায়গা করে নেয়, এরপর শুরু হয় পথচলা।

কোন একসময়, অনুরাগের কাছে দুর্গা পূজা মানেই ঝিমলিকে নিয়ে প্যান্ডেল হপিং, রাত জাগা আর রেস্টুরেন্টে চাইনিজ খাওয়া। এখন ঝিমলিকে অন্য কারো সাথে দেখা যায়, অনুরাগের শার্টের রঙ নিজের কুর্তির সাথে মিলিয়ে কেনে সঞ্চারী। এরা সবাই সহপাঠী। পূজাতে একসাথে ঘোরার প্ল্যান করে ফেলেছে। অনুরাগ, ঝিমলিকে বললো — তোর ফেভারিট রেস্টুরেন্ট আর তোর ফেভারিট চিলি চিকেন — অষ্টমীর রাত — বিল দেবে তোর বয়ফ্রেন্ড আর সঞ্চারী। অনুরাগের কি এখনো ইচ্ছে করছে — ঝিমলি তার মুখোমুখি বসে পূজার একটা সন্ধ্যা কাটাক? হয়তো একটুকরো ভালবাসা এখনো অনুরাগ আর ঝিমলিকে উপহার দেবে এবছরের পূজা।

দুর্গা পুজোতে প্রেম ছিল, আছে আর থাকবে। অনন্ত সুখদায়িনী মা আমাদের জীবনে প্রেমের অনন্ত ধারা বইয়ে দিয়ে চলুক অনন্তকাল ধরে।