রামপক্ষ, বামপক্ষ ও গেছোমূল বাঙালীর রামলালা দর্শন এবং আসছে একুশের ছবি

331

গতকাল সারাদিন রামপক্ষ আর বামপক্ষ মূলতঃ এই দু’য়েই ভারী ছিল ফেসবুক, একটু গ্রে-এরিয়ায় খেলল তৃণমূল কংগ্রেস। ইন্দিরা কংগ্রেস, সমাজবাদী দল,  আপ এরা গ্যালারিতে বসে রামপক্ষেই ছিল, একটু হালকা ডোজে। এটা জাতীয় রাজনীতির ছবি, আর আমার বাংলায় আমরা প্রত্যেকেই আমাদের পরিচিত বৃত্তের প্রচুর প্রোফাইল ছবি হরধণু হাতে রামের লোগোতে  ‘স্টে সেফ’ দেখলাম, যাদের অনেককেই আমরা মানবতাবাদী জানি, হিন্দুত্ববাদী নয়। আসলে এ এক হুজুগ, যে হুজুগে তাঁদের আমরা কাসর বাজাতে দেখেছিলাম বা অকাল দীপাবলীতে মাততে, এই করোনাকালের সূচনা লগ্নে। আমি যাদের কথা বলছি তাঁরা মূলতঃ তৃণমূল কংগ্রেসের সাথেই জড়িত ছিল সাম্প্রতিক অতীতে, যদিও তাঁদের অসন্তোষ ছিলই বর্তমান সরকারের সংখ্যালঘু তোষণ ও এসএসসি এবং প্রাইমারী প্যানেল নিয়ে, আমি মূলতঃ আমার গত কয়েকবছরের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে এ অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।

লেখক- অধ্যাপক জয়দীপ সরকার

আমার এই ছাত্রদের একটা বড় অংশ নানান স্তরে শিক্ষকতার সাথে যুক্ত, যারা প্রাইমারী স্কুলে আছেন, তাদের ক্ষোভ মূলতঃ বেতনক্রম কেন্দ্রিক, এবং উস্থির সেই আন্দোলনে সরকারের ভূমিকা নিয়ে,  না, এদের কাউকেই আমার হিন্দুত্ববাদী বিপদ মনে হচ্ছে না আজও, বাস্তব এটাই আগামী কয়েকমাসে যদি বিজেপির রমরমা বাড়ে এদের সংখ্যা বাড়বে, আর যদি “চার-এক-ষোলোয়” তৃনমূল দান মারে, এরা রে-রে করে তৃণমূল করবে আবার। এরা আসলে ‘ইস্যু’ ভিত্তিক রাজনীতি পন্থী, আর ‘ইস্যু’ শব্দটা আদতে একটা আদর্শগত আড়াল সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত মননের। পারিবারিক দিক থেকে এরা মূলতঃ আবামপন্থী পরিবার থেকে উঠে আসা বা বামজামানায় কোনো না স্থানীয় বামনেতার ঔদ্ধতে বামপন্থী ঘরানা থেকে সরে আসা পরিবারের অংশ, আর তাই এদের বন্ধুবৃত্তে প্রচুর বামপন্থী ছাত্র-যুব এখনো, যাদের সাথে এরা নানান সামাজিক কাজে জড়িয়ে থাকে।

গতকালের ভূমি পূজা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার খুব একটা কিছু মনে হয় নি, কারণ সুপ্রিমকোর্ট যেদিন রায় দিয়েছে, সেদিনই এই দিনটা ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। প্রধানমন্ত্রী করোনা প্রটোকল ভাঙলেন কিনা, সেটা নিয়ে বিতর্ক করা যেতেই পারে, কিন্তু এই ভূমিপূজার বিরোধিতার সে অর্থে কোনো জায়গা নেই, এমনকি বামেদেরও, ওই ট্রাস্ট করবে না সরকার, এটুকু মৃদু আপত্তি তোলা ছাড়া। অযোধ্যা বিবাদ নিয়ে বামদলগুলোর প্রথম থেকেই অভিমত ছিল, হয় দু’পক্ষের সম্মতিতে বা কোর্টের রায়ে মীমাংসা হওয়া উচিত, দ্বিতীয়টি হয়েছে, যদি সেটা তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্য না হত দেশব্যাপী আন্দোলনে নামা উচিত ছিল সেদিনই, আর সেটা যখন হয় নি, তাঁদের আজকের প্রতিবাদ ওই পালিটব্যুরোর বিবৃতি অবধিই ঠিকই আছে, বরং তাঁরা মনোনিবেশ করেছিলেন কাকাবাবুর জন্মদিনে, সঠিক সিদ্ধান্ত, যদিও সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক আবেগী কর্মীর আবেগ ঝরে পড়ছে সেকুলারিজম নিয়ে বা সরকারের প্রায়রিটি নিয়ে।

লক্ষ্য করে দেখবেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় রাম-বামে লড়াইটায় গতকাল বামেদের বয়ান ছিল রাজনৈতিক যুক্তি ও ধর্মনিরপেক্ষতার আবেগ এবং রামেদের বয়ানে ছিল মূলতঃ শ্লেষ। রামেদের শ্লেষ বামেদের হজম করা বেশ কঠিন ছিল গতকাল, তার মূল কারণ আমি আগেই বলেছি হুজুগের সাথে চলা মানুষের সংখ্যা সবকালেই, সবসময়েই বেশী, এত যুক্তিবুদ্ধি তলিয়ে দেখিয়ে না তারা, এরাই ‘দ্য-মাস’। ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনে এই ‘মাস’-এর যে অংশ তৃণমূল ছিল, আজ তাঁদের অনেকেই প্রোফাইলে রাম ছবি সেটে সেই বামদেরই শ্লেষ ছুড়ে দিচ্ছেন যাদের বাম হাতের আশীর্বাদেই কিন্তু তাঁরা রাম ছবি নিজের ওয়ালে সাটতে পারছেন।  কিন্তু তারপরেও এটা ট্রাজেডি নয় বরং ট্র্যাজিক আয়রনি, যেটা আর কেউ না বুঝুক ওই মুকুল রায় নামের লোকটা বুঝতে পারছেন বলেই আমি মনে করি। সংবাদ মাধ্যমে দিল্লীর বৈঠক নিয়ে দিলীপ-মুকুল দ্বৈরথ যেটুকু উঠে এসেছে সেটা দিলীপের দাবীর ১৯০ সিট না মুকুলের ৫০, তার চেয়েও বড় অবজারভেশন মুকুলের এই যে, ৩০ শতাংশ বুথে এখনো বিজেপির বুথকমিটি নেই।

এই ৩০ শতাংশে ওয়াকওভার আর আশীর্বাদের বাম হাত সরে গেলে বিজেপির কি পরিস্থিতি হতে পারে এই বাংলায় সেটা বুঝতে কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক হতে হয় না। বাংলার পাবলিক পালস এখন তৃণমূল বিরোধী। বাম ছাত্র যুবদের একটা ঝাঁক উঠে এসেছে, বামপন্থী আন্দোলনগুলো কিন্তু কনসলিডেট করছে, সেটাকে ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত করতে পারবে কিনা বামদলগুলো সেটা সময় বলবে, কিন্তু তৃণমূলকে শিক্ষা দিতে যে বাম ভোট রামে গিয়েছিল তার একটা বড় অংশ ফিরছে আবার বামে, আর সেই ফেরাটা আর যাই হোক বিজেপির পক্ষে সুখকর নয়। বিজেপির আইটি সেল সোশ্যাল মিডিয়ায় যত সক্রিয়, তার কর্মীবাহিনী কিন্তু রাস্তায় ততটা নয়। এটা মাথায় রাখতে হবে, গত লোকসভা নির্বাচনে কিন্তু ২০ শতাংশ বাম ভোট রামে গিয়ে পড়েছিল, তাতে বিজেপির ঝুলিতে এসেছিল ১৮ টি আসন। বাম ভোট কতটা ফিরে আসছে বামেদের দিকে তার উপর আগামী বাংলার রাজনীতির অনেককিছু নির্ভর করবে।

তাহলে কি ভোট কাটাকাটিতে  তৃণমুলই আবার ক্ষমতায় ? এককথায় বলা সম্ভব নয়, কারণ শুভেন্দু অধিকারী কি করবেন এখনো পরিষ্কার নয়। মুকুলের ভবিষ্যত বিজেপিতে কি সেটা দেখার জন্যও অপেক্ষা করতে হবে। সৌরভ গাঙ্গুলী না স্বপন দাশগুপ্ত না যোগী আদিত্যনাথের মত মডেল ধরে আরো একটু সফ্ট হিন্দুত্বের রামকৃষ্ণ মিশনের কোনো সন্ন্যাসী বাংলার ‘বিজেপি’র  মুখ হয়ে ভাসবেন, সেই সিদ্ধান্তও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আম বাঙালি কিন্তু ২০২০এ দাঁড়িয়ে আছে ২০১০-য়ে আবারও, বদল চাইছে আপ্রাণ, কিন্তু দশ বছর আগের মত নির্দিষ্ট বিকল্প তাঁর হাতে নেই, হুজুগ একঝটকায় মিইয়ে পড়তে পারে মুকুল ফিরলে, আবার হুজুগ আরো চাগার দিতে পারে শুভেন্দু গেলে।

এই জায়গায় বড় প্রশ্ন, বামেরা কি করবে ? বাম কংগ্রেস জোট একটা রাজনৈতিক জোট হিসেবে বিগত ছয় মাসে দানা বেঁধেছে, কিন্তু রাহুলের ও প্রিয়াঙ্কার রাম-নাম টুইটের পরে বাম ভূমিকা কি হবে জোটের প্রশ্নে? বামেরা যদি রাহুল প্রিয়াঙ্কার টুইট মেনে নেয়, তাহলে তাদের জোটের নরম হিন্দুত্বের লাইনের সাথে তৃনমুলের গাঢ় মুসলমানত্ব ও নরম হিন্দুত্বের মিশেল এর সাথে মৌলিক পার্থক্য কতটুকু থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।  আগামী ভোটের রননীতি কিন্তু বামেদের দ্রুত স্পষ্ট করতে হবে, মেইনস্ট্রিম মিডিয়া যতই আগামী নির্বাচন তৃণমূল-বিজেপির পোলারাইজেশনে এখন থেকেই প্রেজেন্ট করার চেষ্টা করুক না কেন, বামেরা কিন্তু ডিসাইডিং ফ্যাক্টর, একটা দম দেখাতে পারলে, ওই মন্দির ওহি বানায়েঙ্গের মত, “কারখানা ওহি বানায়েঙ্গে” বা “এসএসসি ওইসেহি লটায়েঙ্গে”, মানুষ সাথ দেবে, ওই রাহুল প্রিয়াঙ্কার লাইনের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করতে হবে তবে, নেতাই নন্দীগ্রামে মানুষকে সাথে নিয়ে না চলতে পারার ভুলগুলো দিনে তিনবার বলতে হবে, মানুষ যাতে উপলব্ধি করে, আত্মসমালোচনাটা আন্তরিক। চৌত্রিশ বছরের সাফল্য নিশ্চয় জোরের সাথে উচ্চারিত হবে, কিন্তু বিনয়ের সাথে, কারণ চৌত্রিশ বছরের সাফল্য যদি শেষ কথা হত, মানুষ পরিবর্তন করত না তবে। এটা মাথায় রাখতে হবে, ২০১১ সালে বাম সরকার কাজের নিরিখে কিন্তু ভোটে হারে নি, প্রচুর চাকরী হয়েছিল সেসময় এসএসসির মত সংস্থা দিয়ে, বড় কোনো দুর্নীতির অভিযোগ ছিল না সরকারের বিরুদ্ধে, কিন্তু মানুষ মেনে নেয় নি কিছু নেতার ঔদ্ধত্ব ও জনবিচ্ছিন্নতা। এখনো অনেক বাম নেতা কর্মী সোশ্যাল মিডিয়া থেকে একান্ত আলাপচারিতায় ওই চৌত্রিশ-এ বুদ থাকলে, জনবিচ্ছিন্নতা কাটবে না। এটা মনে রাখতে হবে, তৃণমূল সরকারের আমলে ইনডিভিজুয়াল বেনিফিট স্কীমগুলো দিয়ে সরকার কিন্তু উন্নয়নের ছোঁয়া একদম তৃণমূল স্তর অবধি পৌঁছে দিয়েছে, সরকার নিয়ে বিরাট অভিযোগ কিন্তু খুব সাধারণ মানুষের মাঝে নেই, কিন্তু একদম নীচু তলার মানুষ একটা সীমাহীন দুর্নীতি দেখতে পেয়েছে একদম নীচু তলা থেকে, জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যে ক্ষেত্র থেকে কাটমানির অভিযোগ ওঠে নি তৃণমূলের নেতামন্ত্রীদের বিরুদ্ধে।

এবং এর সাথে যোগ হয়েছে সংখ্যালঘু তোষনের অভিযোগ। প্রথম অভিযোগের বিকল্প স্বর হিসেবে বামেদের উঠে আসার কথা ছিল, কিন্তু রননীতির দোদুল্যমানতা ও একজন গ্রহণযোগ্য মুখ সামনে উঠে না আসার কারণে,  না, যৌথ নেতৃত্ব আম-পাবলিক বোঝে না, তাদের একজন প্রিয় নেতাকে মসনদে চাই, বামেরা এখনো ব্যাকফুটে, এবং স্পেস পেয়ে দ্বিতীয় অভিযোগকে হাতিয়ার করে এডভেন্টেজ বিজেপি, কিন্তু বঙ্গবিজেপির খোলনালচে বদল না হলে সোশ্যাল থেকে প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় দাপাদাপির ফল ভোট বাক্সে যাবে না। আগামী তিনমাস তাই আমাদের প্রচুর ঘোড়া কেনাবেচা দেখতে হবে, রাম মন্দির হওয়া আর না হওয়া দিয়ে বাংলার ভোট কিছুই এদিকওদিক হবে না, ঘোড়া যার বেশী  বাংলার রাম-রহিম তার দিকেই ঝুঁকবে, হ্যাঁ, কোনো আদর্শ বা দর্শন আজকের বাংলার রাজনীতির নিয়ন্ত্রক নয়, এটা অপ্রিয় হলেও বাস্তব।