আজও মাটিতে ঘুমান পীরপাল গ্রামের বাসিন্দারা, জানুন কেন

Date:

Share post:

খবরিয়া ২৪ নিউজ ডেস্ক, ৭ জুলাই, দক্ষিণ দিনাজপুর: কুসংস্কার নাকি শ্রদ্ধা? গোটা গ্রাম এখনও খাট ব্যবহার করেন না। শুয়ে থাকেন মাটিতে। কুসংস্কারে বিশ্বাসী হয়ে হোক বা শ্রদ্ধায়, এখনও পর্যন্ত কাঠের তৈরি চৌকি বা খাটে কেউই ঘুমোন না। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর ব্লকের বেলবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের পীরপাল গ্রামে এটাই দস্তুর। দেশ এগিয়ে চলেছে। কত রকমারি খাট ব্যবহার করেন দেশের মানুষ। কিন্তু পীরপালের মানুষ তা থেকে অনেক দূরে। যদি কারও খাটে শোবার ইচ্ছে হয়, তাহলে মাটির তৈরি খাট বানিয়ে নেন। নতুবা মাটিতেই ঘুমোন সকলে।

কেন? তার পিছনে রয়েছে এক ইতিহাস। স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখে মুখে ফেরে তা। জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৭০৭ সালে পীরপালের মাটিতে ইখতিয়ারউদ্দিন মহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির দেহ নাকি সমাধিস্থ করা হয়। এরপর তিনি দেবতা বা পীর রুপে আবির্ভূত হন। এমনটাই বিশ্বাস গ্রামবাসীদের। বীর যোদ্ধাকে মাটিতে শায়িত অথচ গ্রামবাসী খাটে শোবেন? তা কি হতে পারে। গ্রামবাসীদের বক্তব্য, তাঁরা খাটে বা চৌকিতে ঘুমোলে তাদের কাছে নাকি স্বপ্নাদেশে আসে। এমনকি, মেরে ফেলারও ভয় দেখানো হয়। আর সেই ভয়েই পীরপালের মানুষ চৌকি বা খাটে শোন না। গ্রামের আনাচে কানাচে এও শোনা যায়, যাঁরা জনশ্রুতি অমান্য করে খাট ব্যবহার করেছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ নাকি অসুস্থ হয়েও পড়েন। স্বাভাবিকভাবেই ভয় আরও চেপে বসে মনে।

জেলার ইতিহাসবিদরা জানাচ্ছেন, ১৭০৭ সালে সুলতানি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে বখতিয়ার খলজি পাল বংশের লক্ষন সেনকে পরাজিত করে সংগ্রামপুর, দেবীকোট সহ গোটা গৌড় দখল করে নেন। লক্ষন সেন প্রাণ নিয়ে পালিয়ে তৎকালীন বঙ্গে পালিয়ে যান এবং তার সৈনরা পরাজিত হয়ে নদিয়া শহর পর্যন্ত ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে, তিব্বত ও কামরূপ অভিযান বিফল হয়। সৈনবাহিনীও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করতে না পেরে বখতিয়ার খলজি অসুস্থ হয়ে পড়েন। আর তাঁকে ঘুরে দাঁড়াতে হয়নি। শয্যাশায়ী অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয় অল্প কিছুদিনের মধ্যে। বাংলার ১২০৬ বঙ্গাব্দে (ইংরেজি ১৭০৭ খ্রীষ্টাব্দে) তাঁর মৃত্যু হয়। বখতিয়ার খলজির মৃত্যুর পিছনে তার প্রধান সেনাপতির হাত ছিল বলেও অনেকে মনে করেন। বখতিয়ারের মৃত্যুর পর পীরপালে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। যেহেতু তিনি বীরযোদ্ধা ছিলেন তাই তিনি পীর রুপে আবির্ভূত হন বলে গ্রামবাসীরা মনে করেন। তারপর থেকে এলাকার, বিশেষ করে বয়স্করা, চৌকি অথবা খাটে ঘুমোন না। যদিও এই জনশ্রুতি মানতে নারাজ জেলার ইতিহাসবিদ সুমিত ঘোষ। তাঁর যুক্তি, বখতিয়ার খলজি বীরযোদ্ধা ছিলেন। তাঁকে সম্মান জানাতেই পীরপালের মানুষ মাটিতে ঘুমোন।

শ্রদ্ধাই হোক বা স্বপ্নাদেশের ভয়, ইতিহাসের বীর যোদ্ধাকে যে এখনও মনে রেখেছেন গ্রামের মানুষ, তার প্রমাণ কিন্তু মাটিতে শোওয়ার চল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_img

Related articles

ফের শুভেন্দু অধিকারীর কনভয় লক্ষ্য করে ‘চোর-চোর’ স্লোগান

খবরিয়া ২৪ নিউজ ডেস্ক, ২১ মেঃ ফের শুভেন্দু অধিকারীর কনভয় লক্ষ্য করে ‘চোর-চোর’ স্লোগান। তবে এবার আর গাড়ি...

‘কমিশনের নির্দেশে সম্মানহানি হয়েছে’, পাল্টা আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিলেন বিজেপি প্রার্থী অভিজিৎ

খবরিয়া ২৪ নিউজ ডেস্ক, ২১ মে, কলকাতা: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বেলাগাম আক্রমণের অভিযোগে অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়কে সেন্সর করেছে কমিশন। পাল্টা...

‘সেন্সর’ নির্দেশে মানহানি, কমিশনের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার ভাবনায় অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়

খবরিয়া ২৪ নিউজ ডেস্ক, ২১ মেঃ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ‘অশালীন’ মন্তব্যের অভিযোগে নির্বাচন কমিশন অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে...

২১১জন যাত্রী নিয়ে বিরাট দুর্ঘটনার মুখে পড়ল সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের বিমান

খবরিয়া ২৪ নিউজ ডেস্ক, ২১ মেঃ ২১১ জন যাত্রী নিয়ে বিরাট দুর্ঘটনার মুখে পড়ল সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের বিমান। এদিন...