রাসের টানে কোচবিহারে

233
তরুণ রায় চৌধুরী

ঐতিহ্য আর পরম্পরা মেনে আজও ঘুরছে কোচবিহারের রাসচক্র। খেলা, মেলা, উৎসব অনুষ্ঠানের এই সময়েও স্বতন্ত্র কোচবিহারের রাসমেলা। এ যেন রসে ভরা রাস। ২০৭ বছরের প্রাচীন এই মেলাকে নিয়ে কেমন ভাবনা বিশিষ্ট জনদের। স্মৃতির গভীরে ডুবে এই মেলাকে নিয়ে কলম ধরলেন তাঁরা।আধুনিক এই সময়ে দাঁড়িয়ে কি বার্তা দিতে চায় এই মেলা ! উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম বৃহৎ এই মেলাকে নিয়ে মানুষের মধ্যে আজও রয়েছে উন্মাদনা। রাসমেলা নিয়ে স্মৃতি-বিস্মৃতির ঘটনা বহুল বিবরণ প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরছে খবরিয়া ২৪। আজ সেই প্রতিবেদনের প্রথম দিন। আজকের এই পাতায় লিখেছেন ভ্রমণ পিপাসু তরুণ রায় চৌধুরী।    

রাস মানে আনন্দ। মনের একটি অনুভূতি। সেই রাসের টানেই পৌছালাম কোচবিহার রাসমেলায়। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে পদাতিক এক্সপ্রেসে অনেক পথ, নদী পেরিয়ে নিউ কোচবিহার স্টেশনে পৌঁছায় নির্ধারিত সময়ের প্রায় একঘণ্টা পরে। স্টেশনের বাইরে অনেক গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। আমরা একটা অটোতে উঠে বসি। প্রথমে যাব গুঞ্জবাড়ি। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করবেন এক আমাদের এক সাংবাদিক বন্ধু। চালক-সহ অটোতে আমরা বারোজন। পিছন দিকে ঠাসাঠাসি করে চারজন বসার ব্যবস্থা। বাধ্য হয়ে পিছনে বসতে হল। নিদারুণ কষ্টে মন মুক্তির পথ খোঁজে। হরিকে স্মরণ করি। দেখতে দেখতে পার হয় কুড়ি মিনিট। অবশেষে মুক্তি।

গুঞ্জবাড়ি থেকে টোটোয় ওঠা হল। রাজমাতা দিঘীর পাশ দিয়ে রাজ রাজেন্দ্র নারায়ণ রোড ধরে চার মিনিটে কোচবিহার রাজবাড়ি। বা দিকে মিনিট চারেক দূরে সুন্দর আরও একটি দিঘী। জানলাম, এর নাম সাগরদিঘী। দিঘীর চারপাশে অনেক অফিস। ঠিক যেমনটি দেখা যায় কলকাতায় বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগে, সাগরদিঘির কাছে। ১৮০৭ সালে সাগর দিঘির খনন করান রাজা হরেন্দ্রনারায়ণ। একটু বাদে গন্তব্য। জায়গার নাম পামতলা চৌপথী।

ঢিলছোড়া দূরত্বে মদনমোহন মন্দির। ১৮৮৯ সালে এই মন্দির স্থাপন করেছিলেন কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ। এই মন্দিরে রয়েছেন মা কালী, মা তাঁরা, মা ভবানী এবং মদনমোহন। ভগবান বিষ্ণুর অষ্টম অবতার শ্রীকৃষ্ণকে এই মন্দিরে মদনমোহনরূপে পুজো করা হয়। শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা উপলক্ষে রাস পূর্ণিমায় মদনমোহন মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় রাস উৎসব। কোচবিহারে এই উৎসব খুব জনপ্রিয়।

রাধারানি ও তাঁর সখীরা ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের পরমপ্রিয় ভক্ত। শোনা যায়, এক পূর্ণিমার রাতে বৃন্দাবনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভক্তদের সঙ্গে নৃত্য করেছিলেন। ভগবানের সান্নিধ্য এসে আনন্দরসে পূর্ণ হয় সেইসব ভক্তের কামনাহীন হৃদয়। স্রিক্রিশ্ন-ভক্তদের কাছে স্বর্গীয় সেই আনন্দনৃত্যের নাম রাসলীলা। সম্ভবত, ‘রাস’ শব্দটির উৎপত্তি রস থেকে।

ভাগবত গীতায় শ্রীকৃষ্ণকে বলা হয়েছে পরমাত্মা। তিনি পরম-সত্য, জ্ঞান, চেতনা এবং আনন্দ। তিনিই  সৃষ্টির উৎস। সব জীবদেহে তিনি আত্মারুপে বিরাজ করেন। ‘আমি’ অনুভূতি আত্মাকে জন্ম-মৃত্যর শৃঙ্খলে বেঁধে কষ্ট দেয়। অনেক সময় আত্মা জানতে চায় তাঁর আসল পরিচয়। যোগের মাধ্যমে মন থকে ‘আমি’ হারিয়ে গেলে আত্মা অনুভব করে নিজেকে। পরম আনন্দের  অনুভূতি নিয়ে পরমাত্মার সঙ্গে আত্মা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। মন বৃন্দাবনে আত্মা-পরমাত্মার এই মিলনকে সুন্দরভাবে বোঝানো হয়ছে রাসলীলার মাধ্যমে। বাস্তবে ভগবানের আবতার ছাড়া প্রতিটি জীবই আত্মা।

কোচবিহারের মদনমোহন বাড়ি

শোনা যায়, ভেটাগুড়িতে রাস উৎসব শুরু হয়েছিল রাজা হরেন্দ্র নারায়াণের আমলে। পরবর্তীকালে মদনমোহন মন্দির প্রতিষ্ঠার পর রাস উৎসব এল কোচবিহার শহরে। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হয় রাসমেলা। মেলা চলে ১৫ দিন ধরে। দুর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ আসেন এই মেলায়। মেলার দিনগুলোতে মদনমোহন মন্দির প্রাঙ্গণে ঘোরে রাসচক্র। উচ্চতায় চক্রটি প্রায় ৩০ ফুট।

 মদনমোহন মন্দিরের পাশে আনন্দময়ী ধর্মশালা। ২০১৮এর আমরা সেখানে উঠেছিলাম। সংখ্যায় ছিলাম আমরা দুজন। আমাদের থাকার ঘরটি অনেকটা রেলের কামরার মতো। সেখানে আটজনের জন্য চারটি দোতলা বিছানা। ইতিমধ্যে আমরা ছাড়াও আরও দু’জন সেই ঘরে উঠেছেন। তাই বের হওয়ায় সময় তালা দেওয়া যাবে না। ধর্মশালা প্রাঙ্গণে একপাশে মেলা উপলক্ষে তৈরি করা হয়ছে প্যান্ডেল। ভিতরে ত্রিপালপাতা। মেলা দেখতে এসে অনেক কষ্ট করে হলেও সেই প্যান্ডেলেই থেকে যান। ১৮৪১ সালে এই ধর্মশালা স্থাপন করেন রাজা শিবেন্দ্র নারায়ণ। নতুনরূপে এই ধর্মশালাটি ২০০২ সালে জনসাধারানের জন্য খুলে দেওয়া হয়। সেদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কোচবিহারের রাজকন্যা গায়ত্রী দেবী।

দুপুরে খাওয়া রাস্তার ধারে অস্থায়ী এক হোটেলে। সেখানে পাওয়া গেল ডিমের ঝোল, ভাত আর বেগুনের বড়া আসলে আমাদের অতিপরিচিত বেগুনভাজারই আর একটি জিভে-জল-আনা নাম। খাওয়া-দাওয়ার পর জাব সাগ্রদিঘির পশ্চিম পাড়ে জেলাশাসকের দপ্তরে। শীতের দুপুরে হাঁটা শুরু। বেশ ভালোই লাগছিল, রাজরাজাদের শহরে পায়ে হাঁটা এক অনুভূতি।

১৯৫০ সালে কোচবিহার রাজ্য একটি জেলা হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়। রাজার রাজতবের অবসানে জেলা শাসনের দায়িত্ব এসে পড়ে জেলাশাসকের ওপর। নতুন শাসন ব্যবস্থায় রাসমেলার উদ্বোধন করেন জেলাশাসক। প্রথা অনুযায়ী রাস পূর্ণিমার পুন্যলগ্নে তিনি রাজার বেশে প্রবেশ করেন মদনমোহন মন্দিরে। সকলের মঙ্গল কামনায় সেদিন উপোস করে তাঁকেও পুজোয় বসতে হয়। সবশেষে তিনি রাসচক্র ঘোরান। তারপরই শুরু হয়ে যায় আনন্দের রাসমেলা।