অমিতাভ-রাখি- আমজাদ খানদের কথা আজও চর্চা হয় উত্তরের সিটিং পাহাড়ে

162

শিলিগুড়ি সেবক পেড়িয়ে কালিঝোরা । এরপর ১৩ কিলোমিটার শুধু খাড়া পাহাড়ি পথে ঘুরপাক খেতে খেতে উঠে যাওয়া । সেখানেই সিটিং গ্রাম। যেখানে অনুসন্ধান ছবির শ্যুটিং হয়েছিল। সেই এলাকায় ঘুরে লিখেছেন দিব্যেন্দু আরণ্যক।

আজকের কমলালেবুর গ্রাম সিটং কিন্তু বহুদিন নজরে আসে নি দার্জিলিং বা শিলিগুড়ির মানুষের। নজরে আসে দেশের প্রখ্যাত চলচিত্র পরিচালক শক্তি সামন্তের। ১৯৮০ সাল । শক্তি সামন্ত সাহিত্যিক শক্তিপদ রাজগুরুর একটি সিনেমার চিত্রনাট্য ও কলাকুশলীদের নিয়ে ঘাঁটি গাড়েন কালিঝোরা পি ডাব্লিউ ডির পরিদর্শন বাংলোতে । কে নেই সেদিনের শক্তির সেই ফ্লিম প্রোডাকশন টিমে অমিতাভ বচ্চন, রাখি গুলজার, আমজাদ খান, উৎপল দত্ত , প্রেম নারায়ণ ! শুরু হলো ” স্পট ” অনুসন্ধান। দুদিনের মাথায় অমিতাভ ও আমজাদ খুঁজে পেলো তিলক সুব্বাকে । তার দেখানো স্পটই আজকের সিটং! তবে তিলক আজ আর নেই । ওঁর ছেলে সুরেন দাজু সিটং এ এক বেসরকারি রিসোর্টে কুক। ওই পথেই ঘোরা মুনিয়াকে নিয়ে পুলিশ অফিসার অভিজিৎ রাজ ওরফে অমিতাভের চষে বেড়ান পাহাড়ি গাঁ , হুট খোলা ঝিপ নিয়ে হারিয়া সাহুজি ওরফে উৎপল দত্তের ছেলের ভূমিকায় পাহাড়ি জনপদে ত্রাস করে বেড়ান কালিরামের ভূমিকায় আমজাদ খান। গীতিকার রাহুল দেব বর্মণের সুরে লতা মাঙ্গেশকর -কিশোরকুমারের গানে চা -বাগিচায় সবুজের মাঝে লিপ মেলান রাখি -অমিতাভ , ” আমার সপ্ন যে সত্যিই হলো আজ …! ” বা ” ওঠো ওঠো সূর্যাইরে ঝিকিমিকি দিয়া …! “

সিটিং গ্রামে কমলালেবু বাগান। শীতের ম্রসুমে গাছ ভর্তি ফল হয়ে থাকে।


১৯৮১ সালে মুক্তি পেলো কালিঝোরা , সিটংএ শ্যুট হওয়া বক্স অফিসে হিট ছবি “অনুসন্ধান”। প্রথমে হিন্দিতে “অনুসন্ধান” তারপর বাংলাতে । বাংলায় ডাবিং হবার পর হিন্দি অনুসন্ধান নাম পাল্টে হয়ে যায় “বর্ষাৎ কি এক রাত” । এক দশক ধরে দাপিয়ে চলে বাংলার সিনেমা হলগুলিতে “অনুসন্ধান” । মানুষের মুখে মুখে ফেরে , “বলো হরি বোল ! ফেঁটে গেলো ফেশে গেলো কালিরামের ঢোল!” ডাবিং হলো হিন্দিতেও , ” এক বর্ষাৎ কি রাত ” । সারাদেশেও সুপারহিট হয় ” বর্ষাৎ কি এক রাত “। তখন অমিতাভ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির শিখরে। ৩০ এর যুবক । সুপার স্টার । আজ অমিতজী ৭৬ এ দাঁড়িয়ে । নেই কালিরাম ও তার পাহাড়ি মানুষের উপর অত্যাচারী ব্যবসায়ী -কারবারি বাবা হারিয়া শাহু অর্থাৎ আমজাদ খান, উৎপল দত্ত । কিন্তু চল্লিশ বছর পেড়িয়ে গেলেও সেদিন গুলোর স্মৃতি আজও বয়ে বেড়ান সিটং পাহাড়ের বহু মানুষই । যেমন , সেদিনের যুবতী , আজকের কমলালেবু চাষী দেবী রাই , ঝুঙ্কু রাই । খুব কাছ থেকে রাখি -অমিতাভদের দেখেছেন দেবী রাই । “বাত ভি করেছি ! ” বলেন দেবী । বছর ষাটেকের দেবী রাই এর শত বলিরেখা পরে যাওয়া মুখ হাসিতে যেন জলে উঠল! আনন্দে চোখের কোল চিক চিক করে ওঠে! জানাযায়, দেবী রাইদের বাড়ির সেদিনের ছোট্ট দোকানে নিয়মিত আসা যাওয়া ছিলো শক্তি সামন্তের অনুসন্ধান সেটের আর্টিস্টিদের। সুক্ক রাই কিন্তু কালিরামের ভক্ত ! আজও পাহাড়ে কেঊ হুট খোলা গাড়ি নিয়ে এলে উঁকি দিয়ে দেখেন, যেন- কালিবাবু নয় তো! আর সিটং পাহাড়ের নব যৌবনরা , তাঁরা বার কয়েক মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে বা শিলিগুড়ির সিনেমা হলে দেখে ফেলেছে “অনুসন্ধান” !

অনুসন্ধান ছবির পোস্টার

কালিঝোরা বনবাংলোর চৌকিদার ছিলেন রঞ্জিত থাপা । সিটং এর মানুষ । সে সময় শুটিং চলাকালীন অমিতাভ বচ্চন ও আমজাদ খানকে দেখার জন্য ৯ দিনের বেতন কাটা গেছে বলে জানান ৭২ এর বৃদ্ধ রঞ্জিত! তবে শোলের গব্বর ওরফে আমজাদ খানই কিন্তু বেশি মানুষ টানতো সে দিনগুলোতে। জানান মদন , রবি , রঞ্জিত থাপারা । আর অমিতজী! ওঁরা ছিলো পাহাড়ি মেয়েদের মনের মনিকোঠায়! একটু খোঁচা দিতেই ষাট পেড়িয়ে যাওয়া দেবী রাই , রুমী রাইদের হাসি সব বলে দেয়। তবে সুক্ক রাই কিন্তু জানতেন না তাঁর সপ্নের মানুষ কালিবাবু নেই! মারা গেছেন আমজাদ খান । প্রতিবেদকের কাছ থেকে সেটা যেনে এক মুহুর্তের জন্য তাঁকে আর সামনে পা্ওয়া গেলো না । কমলালেবু বাগানের মধ্যে দিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন ! এভাবেই অমিতাভ, আমাজাদ খানরা রয়ে গেছেন সিটং পাহাড়ে!
কিন্তু আজ কেমন আছে “অনুসন্ধান” এর দেশ সিটং! না খুব ভাল নয়। আজ হারিয়া সাউকার বা তারঁ ছেলে কালিরাম নেই । কিন্তু আছে অনেক অনেক সাউকার । সারাবছর পাহাড়ের ঢালে ওঁরা চাষ করে ঝাড়ু গাছ ।

পাহাড়ের গ্রামে সেই সিটিং গ্রাম

শিলিগুড়ির পাইকাররা নাম মাত্র দামে পাহাড় থেকে নিয়ে যায় ঝাড়ুগাছের গোছা । দাম পায় না চাষীরা । সেই কবেই বন্ধ হয়ে গেছে এলাকার অর্থকরী ফসল সিঙ্কোনা চাষ । সেটা সাল ১৯৮৮। কেননা , ম্যালেরিয়া রোগের ঔষধ কুইনাইন এর বিকল্প ঔষধ বের হয়ে গেছে ততোদিনে। প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় সিঙ্কোনার। বন্ধ হয়ে যায় লাটপানচারের সিঙ্কোনা ফ্যাক্টরীটিও। কাজ হারান পাহাড়িয়া মানুষ গুলো । এবারে তাঁরা বেছে নেন ঝাড়ুফুলের চাষ। কিন্তু সেখানেও খরচ ওঠে না। অগত্যা কমলা চাষ। এবারে লাভের মুখ দেখে এখানকার মানুষ। প্রত্যেকের বাড়িতেই কমলা গাছ। শিল্পু ও সিটং এর সব বাড়িতে আছে কমলা গাছ । আর আলদা বাগান তো আছেই।” কিন্তু কমলালেবুর জন্য মাটি তৈরি ও গাছের আয়ু বাড়াবার জন্য কৃষি দফতরকে চাষীদের পাশে এগিয়ে আসতে হবে।” জানান নব্বই এর দশকে ওই এলাকায় লাগাতার সার্ভে করার জন্য মাটি কামড়ে পরে থাকা পরিবেশ আন্দোলনের নেতৃত্ব “ন্যাস গ্রুপ “:এর কর্ণধার অরুপ গুহ।  অরুপবাবুর আশঙ্কা, সরকার ও কৃষি দফতর রখানকার মানুষগুলোর জন্য এগিয়ে না হলে সিনকোনা চাষের বন্ধের ধাক্কা ওঁরা সামলে নিয়েছেন, কিন্তু কমলা চাষ বন্ধের ধাক্কা ওরা নিতেই পারবেন না । হারিয়ে যাবে বহু পুরনো পাহাড়ি জনপদ সিটং!” এখানকার কমলালেবু যাতে বাজার পায় তার দাবী রেখেছেন স্থানীয় কমলাচাষী বিজয় থাপা , হেমন্ত থাপা । সিটং এ কোনো রুটের গাড়ি চলে না । রুটের গাড়ি চালানো সম্ভব হলে প্রাকৃতিক মনোরম শিটং ও লাটপানচার এ ঢল নামবে পর্যটকদের । এতে আয় বাড়বে । এই আশায় বাঁচেন এখানকার সুনীল থাপা , বাপ্পী থাপা , দুর্গা রাইরা ।

ছবি সংগৃহীত

হর্টিকালচার বিভাগ একটু নজর দিলে এখানকার ফুলচাষীরাও লাভের মুখ দেখবেন। আরও উদ্যোগী হতে হবে ট্যুরিজ্যম বিভাগকেও। কেননা ইতিমধ্যেই প্রচুর ট্যুরিস্ট লজ এই এলাকায় গড়ে উঠেছে। আসছেন দূরদূরান্তের পর্যটকরাও। একটু উদ্যোগ নিলে “অনুসন্ধান” র দেশ সিটং, শিল্পু , লাটপানচারের নৈসর্গিক প্রকৃতিতে পর্যটকদের ঢল নামবে । আজ থেকে চল্লিশ বছর আগেই বলিউড তারকারা যেভাবে দু’দফায় “অনুসন্ধানের” শুটিং করে গেছেন, যখন এলাকা অনেক দুর্গম । আজ এতো বছর পরেও কেনো আর কোনো সিনেমার কাজ হলো না তা বুঝে উঠতে পারেন না এখানকার মানুষ। ওঁরা আজও আশা নিয়ে বাঁচেন, যে কোনোদিন এই পাহাড়ে আবার “লাইট -ক্যমেরা -একশন” -শুনতে পারবেন। আয় বাড়বে তাঁদের । ভাল থাকবেন পাহাড়ি মানুষগুলো। হাজারো পাখির কলতান , ধুপি গাচে ঘেরা সিটং লেক , জানা অজানা পাহাড়ি ফুলে সমৃদ্ধ “অনুসন্ধান” এর দেশের পাহাড়ি পথের বাঁকে বাঁকে চা -বাগিচায় কান পাতলে যেনো আজও ভেসে আসে লতার কণ্ঠে,  ফুলকলি রে ফুলকুলি …বল তো এটা কোন গলি ! এই গলিতে একবার যে তো আসে সেই তো ফাঁসে ! ” সত্যিই ভালবেসে ফেঁসে যাওয়ার জায়গা হিমালয় পর্বতমালার সিঙ্গেলেলা রেঞ্জের কার্শিয়াং মহকুমার সিটং!

লেখক পরিচিতিঃ লেখক পেশায় শিক্ষক। দীর্ঘ সময় ধরে সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত। একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। মোহনা নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন।