পান্তাভাত ও মাছভাজা ভোগে পূজিত হন মানসিংহের আরাধ্য দেবী সর্বমঙ্গলা

75

কার্ত্তিক গুহ,পশ্চিম মেদিনীপুরঃ পান্তাভাত ও মাছভাজা ভোগে পূজিত হবেন “বিজয়মঙ্গলা”। বাংলার প্রাচীন পুজো গুলির মধ্যে পশ্চিম মেদিনীপুরের সর্ব্বমঙ্গলা অন্যতম। কথিত আছে রাজা মানসিংহের আমলের আগে থেকেই কেশিয়াড়িতে রয়েছে দেবী সর্ব্বমঙ্গলার মন্দির। মূল মন্দিরটি মোট তিনটি ভাগে বিভক্ত। যার শেষ ভাগে অর্থাৎ বর্তমানে মন্দিরের ঢোকার মুখে যে অংশটি রয়েছে তা রাজা মানসিংহের আমলে তৈরি হয়েছে বলে জানা যায়। তবে এই সর্বমঙ্গলা মূল মন্দিরটি কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার সঠিক সময় নিয়ে মতান্তর রয়েছে। এই দেবী অত্যন্ত জাগ্রত বলে ধর্মপ্রান মানুষের বিশ্বাস। এখানে  শারদোৎসবের সূচনা হয় সর্ব্বমঙ্গলা মন্দিরে পূজার মাধ্যমে।

নেই থিমের বিচিত্র হাল ফ্যাশনের আলোর কারসাজিও থাকে না উৎসব অঙ্গনে, তবুও অতি আধুনিকতার এই সময়ে প্রাচীন প্রথা মেনেই হয় এই পুজা। আর তাতেই ভিড় উপচে পরে সাধারন মানুষের। ঐতিহ্য পরম্পরাকে মেনে আজও পূজিত হয়ে চলেছেন দেবী সর্বমঙ্গলা। অতীতের নিয়ম মেনে আজও দেবীকে প্রত্যহ রাতে মাছ ভাজা সহ পান্তাভাত ভোগ দেওয়া হয়।

কথিত আছে, সুদূর অতীতে কেশিয়াড়ি এলাকাটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। প্রাচীন ইতিহাসের বিবরণ থেকে জানা যায়, পাল্কিতে চেপে পথ পরিক্রমা করার সময় কোন এক সধবা মহিলা একটি কুলের গাছ তলায় বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সেই মহিলাই আসলে দেবী সর্ব্বমঙ্গলা। আরও কথিত আছে যে, রাজা মানসিংহের মনস্কামনা পূর্ণ করেছিলেন এই দেবী। তাই দেবীর নিত্যপূজার জন্য তিনি অনেকটা জমি দিয়েছিলেন। ময়ূরভঞ্জের এক রাজা, সিংভূমের রাজা, খড়্গপুর গ্রামীণ এলাকার খেলাড়ের জমিদার শতপথি পরিবার, বেলদার কূশমুড়ির জমিদার দেব পরিবার সর্ব্বমঙ্গলা মায়ের নামে শুধু জমি নয় গয়না এবং মন্দিরও দান করেছিলেন। সর্ব্বমঙ্গলা এতটাই সাধারনের দেবী অনেকেই দেবীকে কন্যাস্নেহে ‘মঙ্গলাবুড়ি’ বলেও সম্বোধন করেন। শুধু কেশিয়াড়ি, বেলদা বা খড়্গপুর, নয়াগ্রাম নয়। পার্শ্ববর্তী রাজ্য ওড়িশা থেকেও বহু মানুষ আসেন পূজা দিতে। এখানে মানত পূরণে দেবীকে নতুন বস্ত্র পরানোর রীতি রয়েছে। তাই এলাকার মানুষের মধ্যে প্রচলিত কথা ছিল ‘মঙ্গলাবুড়ির ষোল ঘড়ি ষোল বেশ’।

প্রসঙ্গত এখানকার দুর্গাপূজা শুরু হয় পঞ্চমী থেকে । আর ওই পঞ্চমীর দিন  ঘট উত্তোলনের মধ্য দিয়ে  সর্বমঙ্গলা রূপী “বিজয়মঙ্গলাকে” দেবী দুর্গা রূপে পূজা করা  হয়।পুজোর পঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রত্যহ চাল কুমড়োর বলি দেওয়া হয় ।

দেবীর মন্দিরের সংস্কার, বিষয়সম্পত্তি দেখভাল এবং নিত্যপূজার পরিচালনার জন্য একটি ট্রাষ্টবোর্ড ছিল। সেই বোর্ডের বহু সদস্য এখন আর নেই। এখানকার পুরানো নাটমন্দিরটি শুরু নিয়ে মতান্তর থাকলেও মন্দিরের বর্তমান সামনের অংশটি রাজা মানসিংহের আমলে তৈরি বলে জানা যায়।

সর্ব্বমঙ্গলা হল কেশিয়াড়ির মানুষের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার দেবী। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে। গর্ভগৃহের পবিত্রতা অক্ষুন্ন রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এখানে বছরের বিভিন্ন দিনে বিয়ে সহ অন্যান্য পবিত্র অনুষ্ঠান হয়। দেবী নিরামিষাশী নন বলে অনেকেই মাছের ঝোল সহ ভোগ দেন। তবে মাছের পদে পেঁয়াজ রসুন ব্যবহার হয়না। দূর্গাষ্টমী ও বাসন্তী অষ্টমীতে নিরামিষ ভোগ হয়। প্রতি শনি ও মঙ্গলবারে প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়’। দূর্গাপূজার সময় সর্ব্বমঙ্গলাকে দেবী দশভূজা রূপে পূজিত হন। তবে মহালয়া থেকে চতুর্থী পর্যন্ত মূল মন্দির বন্ধ রাখা হয়। মন্দিরে ভেতরের অংশ এবং দেবীকে নব রূপে সাজিয়ে তোলা হয়। তখন মন্দিরের সামনে সর্বমঙ্গলা কে দূর্গা রূপী বিজয়মঙ্গলাকে পূজা করা হয়। পঞ্চমীর দিন দেবীর পূজা শুরু হয়। দূর্গাপূজার সময় অন্নকূটের ব্যবস্থা থাকে। অজস্র মানুষ আসেন দূর্গারূপী দেবী সর্ব্বমঙ্গলাকে পূজা দিতে। শুধু দূর্গাপূজা নয় কালী পূজার সময় দেবী কালিকা এবং বাসন্তী পূজার সময় দেবী বাসন্তী রূপে পূজিত হন। গর্ভগৃহে আজও দেবীর আসন রয়েছে সেই কুলগাছের মূলে।