করোনার বিরুদ্ধে লড়াইটা ‘টি-টোয়েন্টি ম্যাচ’ নয় , ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া ‘টেস্ট ম্যাচ’

145

পোস্ট করোনিয়ান যুগে আমাদের এই অসামাজিক হয়ে বেঁচে থাকাকে কি বেঁচে থাকা বলব, নাকী oxymoron -এর উদাহরণ দিয়ে বলবো ” মরে বেঁচে থাকা “। এতো ইঁদুরের মত বেঁচে থাকা। গর্তের মধ্যে সেঁধিয়ে আছি। মাঝে মাঝে খাবার সংগ্রহের জন্য বাইরে বেরোচ্ছি। চাল-ডাল কিনে এনে মজুদ করছি,  আর মুখের উপর মুখোশ পড়ে গর্ত থেকে মাঝেমধ্যে মুখ বের করে দেখে নিচ্ছি অবাঞ্ছিত অতিথির আগমন ঘটছে কীনা।  চলছে নির্বাসনী প্রচার -তফাৎ যাও ! তফাৎ যাও !  একলা থাকো, একলা রাখো। রাস্তাঘাটে, অফিস, ব্যাঙ্কে  কান পাতলেই পিচিক্ পিচিক্ – স্যানিটাইজার স্প্রে।  গাড়ির সিট,  বাজারের ব্যাগ,  বিছানার চাদর -সর্বত্রই ফ্যাঁসফ্যাঁস শব্দে স্যানিটাইজার ড্রপলেটের বাতাসে মিলিয়েযাওয়ার দৃশ্য।

অনির্বাণ নাগঃ

যে মা ঠাকুমারা গঙ্গা জল দিয়ে হাত না ধুয়ে ঠাকুর স্পর্শ করতেন না,  আজকাল তারাও অ্যালকোহলে হাত শুদ্ধ করে ঠাকুর ঘরে ঢুকছেন । আপনজন,  প্রিয়জনেরা এখন প্রয়োজন ছাড়া আপনার সাথে দেখা করে না।  প্রয়োজনে আপনার বাড়িতে এলে আপনিও আঙ্গুলের ছোঁয়া বাঁচিয়ে সন্তর্পনে চায়ের কাপ এগিয়ে দেন তার দিকে।  এ এক নয়া অস্পৃশ্যতাবাদ। সেই কবে রবীন্দ্রনাথ লিখে গিয়েছিলেন “সভ্যতার সংকট”।  আজ সেই সংকট যে এইভাবে অস্পৃশ্যতা এবং কাউন্টার অস্পৃশ্যতার মোড়কে আমাদের মুড়ে ফেলবে,  কে ভেবেছিল !  কাজের মাসি নেই,  রান্নার লোক নেই।  নাও, এবার ঠ্যালা সামলাও।  ঘুম থেকে উঠে হাতা খুন্তি স্যানিটাইজ  করে কাজে লেগে পড় রে !  মাথা ঢেকে,  দস্তানা পড়ে ঝুল পরিষ্কার কর রে !  ড্রাইভার বলে দিয়েছে আগামী একমাস আসবে না। সাহেবের বাড়িতে করোনার ভয় বেশি। বস্তি এলাকায় ওসবের প্রকোপ  অনেক কম।  মুম্বাইয়ের ধারাভি বস্তির  কথা নাকী  এখন অতলান্তিক পেরিয়ে ইউ. এন. ও.-র সদরদপ্তরের কর্তা ব্যক্তিদের মুখে। গা ঘেষাঘেষি ঘরে বাস করেও ওরা নাকি করোনাকে রুখে দিতে পেরেছে। আর আপনি ? সদর দরজায় তালা দিয়ে,  তিনবার করে চান করে, আঠারো বার হাত ধুয়ে, চব্বিশবার গার্গেল করেও সামাল দিতে পারেননি রোগের প্রবেশ।  ধারাভি বস্তি থেকে তো খুব দুরে নয় জলসা বাংলো।  কোনদিন স্বপ্নেও ভেবেছিলেন এই কাউন্টার অস্পৃশ্যতার কথা ?  তুমি যাকে দূরে ঠেলে ফেলে এসেছ এতকাল, সে তোমাকে দূরে ঠেলছে এবার।

করোনা যেমন কেড়েছে অনেক প্রাণ,  তেমনি কেড়েছে আমাদের মানবিকতা।  প্রি- করোনিয়ান যুগে যে মুখোশ আমরা পড়ে থাকতাম,  করোনা এসে একটানে খুলে ফেলে দিল সেই অদৃশ্য মুখোশ,  পরিয়ে দিল সার্জিকাল মাক্স। বেরিয়ে পরলো আমাদের কুৎসিত কদাকার মুখ।ফ্রন্টলাইনারদের বাড়িতে ঢুকতে না দেওয়া,  অ্যাম্বুলেন্সে রোগী পড়ে থাকল ঘন্টার পর ঘন্টা,  নামানোর কেউ নেই,  মৃতদেহ দাহ করার লোক নেই, প্রতিবেশীদের কটুক্তি,  রোগীর পরিবারের প্রতি লাঞ্ছনা-গঞ্জনা – বেরিয়ে পড়ছে সর্বাঙ্গের ক্ষত।  মলম লাগাবি কত !

বেশ তো ছিলাম।  চকচকে ব্লেডে দাঁড়ি কামাচ্ছিলাম, কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে, সোফায় গা এলিয়ে টিভির সান্ধ্য বিতর্ক দেখছিলাম, ফেসবুকে বিপ্লব করছিলাম, আবার ঝাঁকের  কই ঝাঁকে মিশে যাচ্ছিলাম। কোথাকার কোন এক ন্যানো সেন্টিমিটার অণুজীব এসে এতো দিনের সাজানো বাগান কে একেবারে তছনছ করে দিলো !

মুদির দোকানের বাইরে গোল গোল দাগ পড়ল, মুখে উঠলো মুখোশ,  হাতে দস্তানা। পাঁচ কেজি চাল হলেই যে বাড়িতে সারা মাস চলে যেত সেই বাড়ির গৃহকর্তা বস্তা বস্তা চাল নিয়ে যুদ্ধজয়ীর ভঙ্গিমায় বাড়িতে ফিরলেন এবং গৃহিণী বীর যোদ্ধাকে বরণ করে নিলেন। শাঁখ বাজল, থালা বাজল, উলুধ্বনিতে মুখরিত হল সারা পাড়া।  আছি,  বেঁচে আছি এভাবেই।  আর এভাবেই বেঁচে থাকতে হবে আপাতত,  বাঁচিয়েও রাখতে হবে।  এটা টি-টোয়েন্টি ম্যাচ নয় , ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া টেস্ট ম্যাচ। দেখে খেলতে হবে।  ৬৪ বলে ৪ হলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু টিকে থাকতে হবে টীকা না আসা পর্যন্ত।  অফ স্টাম্পের বাইরের বল ছাড়তে হবে। তারপর আসবে সেই আকাঙ্ক্ষিত লুজ বল। “বাপি বাড়ি যা” বলে লং অনের উপর দিয়ে করোনাকে পাঠিয়ে দিতে হবে যমের বাড়ি। সেই দিনের দিকে তাকিয়ে আছি।