৪ শতকের ধরে চলছে টাকীর কূলেশ্বরী কালীবাড়ির কালীপূজা

53

শ‍্যাম বিশ্বাস, উওর ২৪ পরগনাঃ বসিরহাট মহকুমার টাকী পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডে অবস্থিত টাকী কূলেশ্বরী কালীবাড়ি। মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা রাজা প্রতাপাদিত্য। যদিও সংস্কার করে পাকা মন্দির হয় অনেক পরে। প্রথমে ছিল খড় ও গোলপাতার চালে মাটির ঘরে পুজো,পরে ধীরে ধীরে সংস্কার হয়। মন্দিরটির সঠিক প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে অনেকে দ্বিমত পোষণ করেন,তবে প্রায় ৪০০ বছরেরও বেশী সময় আগে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। কার্তিকী অমাবস্যার কালীপুজোর দিন প্রতিবছর প্রচুর লোকের সমাগম ঘটে এখানে। টাকী, হাসনাবাদ,বসিরহাট, কলকাতা সহ দূর-দূরান্ত থেকে প্রচুর ভক্ত এবং দর্শনার্থীদের আগমন হয় এই সময় টাকীর কূলেশ্বরী কালী মন্দিরে।

কথিত আছে যে, এই কূলেশ্বরী কালীর আদি মন্দিরটি ছিল হাসনাবাদের রজিপুরের কালীতলায়। কালীতলা থেকে বিসর্জন দেওয়া ঘট কূলে ভেসে আসায় সেই ঘটেই কূলেশ্বরী কালীবাড়ির প্রতিষ্ঠা হয় বলে মত পণ্ডিতদের। ছোট করে মন্দির প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর বাংলার বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম যশোহরের ভূঁইয়াধিপতি প্রতাপাদিত্য, যাঁর সাথে আকবরের সেনাপতি মান সিংহের যুদ্ধ হয় একবার তিনি বারেন্দ্রভূমির ব্রাক্ষ্মণ-‘মৈত্র’ উপাধিপ্রাপ্ত অনন্ত চক্রবর্তীকে টাকীর কূলে নিয়ে আসেন পূজার্চনা ও দেবসেবার জন্য। টাকীর কূলের মৈত্রগণ ছিলেন সমাজচক্রের অগ্রণী তাই চক্রবর্তী বলেই খ্যাত ছিল। বাংলা ৪৭০ সালে, ইংরেজী ১০৬৩ সালে কান্যকুব্জ থেকে দুর্ভিক্ষ পীড়নে কাতর হয়ে ১০০ ঘর মল্লিক ব্রাক্ষ্মণ বারেন্দ্রভূমে চলে আসেন, তারাই বারেন্দ্রব্রাক্ষ্মণ বলে খ্যাত।

নির্দিষ্ট করে কূলের আদি কোন সাল না থাকায় এর প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে অনেক মতবিরোধ থাকলেও, তবে প্রতাপাদিত্যের রাজত্বকালেই এই মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। সেই হিসাবে ৪ শতক অতিক্রান্ত এই মন্দিরটি। একসময়ে মায়ের আরাধনায় এবং পূজার্চনায় লিপ্ত ছিলেন স্বামী সর্ব্বানন্দগিরি মহারাজ। পাশাপাশি টাকী ইছামতীর তীরে স্বর্ণময়ী শ্মশানের পাশে টাকী ‘মা কূলেশ্বরী সেবাশ্রম সংঘ’ নামে আশ্রম ও ত্রিশক্তি মন্দিরের প্রতিষ্ঠা হয়েছে যেখানে মা কালিকা, মা তাঁরা এবং মা বগলা পূজা হত বলে যানা গেছে।

 এই কুলেশ্বরী কালীবাড়ির প্রতিমার চারটি হাত রূপোর। কালীপুজোর দিন আদিমন্দিরে মায়ের বিশেষ পুজোর পর এখানে অমাবস্যা শুরু হওয়ার পরে এবং শেষ হওয়ার আগে মায়ের পুজো সম্পন্ন হয়। পাঠা বলি, কুমড়ো বলির প্রচলন এখনও আছে। পরদিন মায়ের ভোগ চড়ানোর জন্য রান্না হয় খিঁচুড়ী, পোলাও, পক্কান্ন, সবজী, মাছের ঝোঁল, পাঠার মাংস প্রভৃতি। মন্দিরের ভক্তদের জন্যও ভোজনের ব্যবস্থা থাকে। প্রচুর মানুষ বড় বড় ডালা নিয়ে আসেন পুজো দিতে। অনেকে বার্ষিক পরম্পরা মেনে, তো কেউ মানসিক করেও আসেন পূজা দিতে। পুজোর সময় কূলেশ্বরী মা কে প্রচুর ফুল এবং গয়না দিয়ে সাজানো হয়, বছরের অন্য সময় গয়না ব্যাংকের ভল্টে রাখা থাকে। পুজোর সময় এত বেশী মানুযের আগমন ঘটে যে হাসনাবাদ থানা থেকে প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়। শোনা যায়, পূর্বে টাকীর রায়চৌধুরী জমিদারদের এই পূজার আগে ও পরে কামান ফাঁটানো  প্রচলন ছিল।