শীতের পিকনিকের মজাই আলাদা

670

শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন। বঙ্গজ ঋতুতে শীত একটা বড় ভূমিকা পালন করে। এই শীতের আমেজ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে শীত আতঙ্কও। তবুও শীত শেষেই আসবে বসন্ত। ফুলে ফলে পল্লবিত হবে মানুষের হৃদয়। এই শীতে মানুষ যেন খুঁজে পায় এক অন্য অনুভূতি। শীতের আমেজে রকমারি খাওয়া দাওয়া, রকমারি পোশাক যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে শ্লথ হয়ে যাওয়া কাজের গতিও। সব মিলিয়ে শীত যেন উপভোগেরই।

বছর শেষে ঠাণ্ডার প্রকোপ থাকে বেশী। যেন জাঁকিয়ে শীত। কুয়াশা ভেদ করে বেরাতে যাওয়া থেকে শুরু করে বনভোজন। আহারের নানা বাহার এই সময়েই পেয়ে থাকে এই বাংলার মানুষ। বর্ষবরণের প্রস্তুতি হয় এই সময়েই। সব মিলিয়ে শীত যেন উৎসবের মরসুম। এই শীতে আমাদের ধারাবাহিক প্রতিবেদন “শীতের গীত”। আজ তার অষ্টম দিন, এই পর্বে লিখেছেন সংবাদ মাধ্যমের কর্মী মুক্তাঙ্কন বর্মণ।   

মুক্তাঙ্কন বর্মণ

একেই প্রকৃত অর্থে বলে শীতের পিকনিক। তখন আমি সবে মাত্র ডি.এড করতে কলেজে ভর্তি হয়েছি। আর সেই কলেজ গুলিতে শীতের মরশুমে কলেজ থেকে পিকনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বভাবই আমিও সেই পিকনিকের মজা উপভোগ করবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ ছিলাম। কলেজের স্যারের সাথে একটু সম্পর্ক ভালো থাকায় পিকনিকের অনুমতি নেওয়া ও জায়গা ঠিক করবার ভার আমার ও এক বন্ধু উপর পড়ল। এরপরই আমরা গিয়ে কথা বলি আমাদের চেয়ারম্যান স্যারের সাথে। স্যার আমাদের সব কথা শুনে বললেন চল তবে, একদিন সময় করে ঘুরেই আসি।  এরপর আমারা ঠিক আছে তবে তাই হোক বলে কলেজ থেকে চলে এলাম। এরপর এক রবিবার আমি আর দ্বৈপায়ন( আমার সহ পাঠি) স্যারের সাথে বেরিয়ে পড়লাম ডুয়ার্সের পথে।

এরই মধ্যে স্যারের বলা নির্দিষ্ট জায়গা থেকে আমি আর উঠে পড়লাম স্যারের গাড়িতে। গন্তব্য ডুয়ার্স। আমাকে স্যার বলল মুক্তাঙ্কন তুই মোবাইলের জিপিএস টা খুলে রাখিস। আমি তখন বললাম চিন্তা নেই খোলাই আছে। পথের ঠিকানায় চলতে চলতে আমরা পৌঁছলাম আলিপুরে। সেখানে কিছুক্ষন বিশ্রাম করে আলিপুর মেইন রোড ধরে রওনা হলাম বক্সা ও জয়ন্তীর উদ্দেশ্য। গাড়িতে করে যত এগোচ্ছি, এক অন্য রকম অনুভূতি আমাকে গ্রাস করছে। মেইন রোড ধরে এগোনোর কিছুক্ষন পরেই আমি লক্ষ্য করলাম হাতের বাঁ পাশে অনেকটা জায়গা অধিকার করে দাড়িয়ে রয়েছে আলিপুরদুয়ার জংশন ষ্টেশন। এরপর যা দেখলাম তা শুনলে আপনারা অবাক হয়ে যাবেন! তা হল নিজের সময়কে হাতে নিয়েই দ্রুত গতিতে দুপাশে গভীর বনকে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে একটি ট্রেন, কিন্তু হঠাৎ দেখি থেমে গেল সেই ট্রেন। কিন্তু কেন যানেন সামনে পড়েছে হাতিরপাল। সেই দৃশ্য যেন সত্যিই আমার চোখকে মুগ্ধ করল। এরপর সেইসব বিভিন্ন দৃশ্যকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গেলাম বক্সার দিকে। দুধারে বন যেন আমাদের বরন করছে সেইসময় আমার এমনটিই মনে হচ্ছিল। এরপর ডুয়ার্সের একটি জায়গায় আমাদের গাড়িটিকে দাড় করিয়ে চলল চ্যাকিং। সেখানে কিছু টাকা দিয়ে ঢুকতে হয়। জানলাম ওই চেক পয়েন্ট থেকেই বক্সা টাইগার রিসোর্ট শুরু।

সেখানকার কাজ শেষ করে যতই বনের গভীরে যাচ্ছি খুঁজে পাচ্ছি যেন এক অন্য অনুভূতি। এক অন্য আমেজ। আশ্চর্য হলেও এটা সত্যি, বনের গভীরে দুটি রাস্তা নিজ গন্তব্যে চলে গেছে, উপরের রাস্তাটি ডুয়ার্সের গারোবস্তিতে চলে গেছে। সেখানে অনেক আগেই পিকনিক করতে গিয়েছিলাম। সেখানে ইচ্ছা ছিল না আমার, বন্ধুও আমার সাথে সহমত। অগ্যতা আমাদের কথা মতো স্যার চললও বক্সার রাস্তা ধরে, যেতে গিয়ে রাস্তায় এক স্থানীয় এক বয়স্কলোক বলল কোথা থেকে আসছেন আপনারা ? স্যার গাড়ির কাঁচ নামিয়ে বলল কোচবিহার থেকে। উনি বললেন ঠিক আছে, তবে সন্ধ্যার আগেই এখান থেকে চলে যাবেন। কারন হিংশ্র জন্তুর পাশাপাশি এখানে ছিনতাইবাজেরাও সক্রিয়। স্যার উত্তর দিল, ঠিক আছে। আমরা চুপচাপ বসেই রইলাম। তবে ডুয়ার্সের সেই জায়গা আমাদের পছন্দ হল না।

এরপর আমরা আমাদের পরিকল্পনা পরিবর্তন করে জায়গা ঠিক করলাম ফালাকাটা হয়ে ময়নাগুড়ি দিয়ে প্রায় মাইলখানেক ভিতরে লালিগোরাস। ওখানেও বেশ রোমাঞ্চ। দুপাশে সারি সারি পাহাড়কে পিছনে ফেলে তার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে বাস। তবে পিকনিকের জায়গাটি পাহাড় থেকে অনেকটাই নীচে। শীতের এই সময়ে বেশ রোমাঞ্চ যেন সবার মধ্যে। এরই মধ্যে ঘটল বিপত্তি, খাড়া পাহাড়ি রাস্তায় ফেঁসে গেল বাস। তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নিয়ে এগিয়ে চললাম গন্তব্যের দিকে।

সেখানে নেমেই স্যার আমাকে আর আমার বন্ধু দ্বৈপায়নকে নির্দেশ দিলেন সবাই ঠিকঠাক মতো নেমেছে কিনা দেখে নিস। আমরা সেই মতো সবাইকে বললাম সব ঠিকঠাক আছে তো। সবাই তারস্বরে উত্তর দিল ওকে, সব ঠিক আছে, তোদের চিন্তা করতে হবে না। এরপর বাসের ড্রাইভারেরা বাসটিকে নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দিল। 

এরপর রাঁধুনিরা রান্নাতে ব্যস্ত হয়ে গেল। আমরা যে যার মতো জায়গাটি ভালো করে দেখতে থাকলাম। দুপাশে পাহাড়কে ফেলে তার মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে খরস্রোতা নদী। সেই নদীর ধারে আমাদের ছাত্ররা ঘুরতে ব্যস্ত। ঠিক যেন অন্য জায়গায় এসে সেখানকার আনন্দ উপভোগে মসগুল তাঁরা। মেয়েরা ছবি তুলতে আর আমরা রান্নার কাজে হাত লাগালাম। নইলে ফিরতে হয়তো রাত হয়ে যেত। যেহেতু শীতকাল তাই সেখানে আমরা ছাড়াও গিয়েছিল অন্যান্য পিকনিকপ্রেমীরা। তাঁদের সাথেও আমরা মজা করলাম। এরপর ধীরে ধীরে বেলা গড়িয়ে বিকেল হল। এদিকে ততক্ষনে রান্নাও শেষ হয়ে গিয়েছিল। এরপর আমরা সবাই খাওয়াদাওয়া করে পিকনিকের সরঞ্জাম গোটানোর জন্য প্রস্তুত হলাম। কিন্তু তাও যেন আনন্দ বাধ মানে না।